নড়বড়ে কাঠের সাঁকোতে ঝুলে আছে ১২০ কোমলমতি শিশুর অনিশ্চিত পথচলা


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৮, ২০২৫, ১২:০৫ AM /
নড়বড়ে কাঠের সাঁকোতে ঝুলে আছে ১২০ কোমলমতি শিশুর অনিশ্চিত পথচলা

প্রভাষক গিয়াস উদ্দিন সরদার, পাবনা প্রতিনিধিঃ

পুরাতন নড়বড়ে এক কাঠের তৈরি সাঁকো ভাঙলেই থেমে যাবে ১২০ জন শিশুর অনিশ্চিত পথচলা।

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার দিলপাশার ইউনিয়নের পুঁইবিল গ্রামে অবস্থিত পুঁইবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই সাঁকো দিয়েই চলাচল করে ওইসব কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে ও জাতীয়করণ হয় ২০১৩ সালে। এখানে প্রায় ১২০ জন ছাত্র-ছাত্রী কে ৫ জন শিক্ষক প্রতিদিন পাঠদান দিয়ে আসছেন। কিন্তু এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া মানেই প্রতিদিনের এক দুর্বিষহ যাত্রার নিত্তনৈমিত্তিক অভিজ্ঞতা। বিকল্প পথ না থাকায় ওই নড়বড়ে পুরাতন কাঠ-বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করতে বধ্য হয় এসব শিক্ষার্থীরা। সাঁকোর নীচে পচা পানি ও কচুরিপানায় ঢাকা এক অজানা গভীরতার পরিত্যক্ত জলাশয়। ফলে অজানা ও অপ্রত্যাশিত দুঃসংবাদের আশঙ্কায় অভিভাবকদের কপালেও ঝুলে থাকে সুগভীর দুঃশ্চিতার ভাঁজ। 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ২০ হাজার টাকা সহযোগিতা, বিদ্যালয়ের স্লিপ ফান্ড এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় মোট ১ লাখ টাকা ব্যয়ে সাঁকোটি তৈরি করা হয়। কিন্তু বাঁশ ও কাঠের কাঠামো বেশি দিন টেকেনি, বর্ষায় নাজুক হয়ে পড়েছে সাঁকোটি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্কুলের সামনে বিশাল পরিত্যক্ত জলাশয়। ওই জলাশয়ের ওপরই স্কুলে যাতায়াতের জন্য পুরাতন কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি সাঁকো। উপরে কচুরিপানা জমে আছে, নীচে কত গভীর পানি আছে তা কেউ জানে না। শিশুরা সারিবন্ধভাবে প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে। সাঁকোর তক্তা নড়ছে মনে হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। এই নড়বড়ে সাঁকোর উপর দিয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করছে ১২০ জন শিক্ষার্থী ও পাঁচজন শিক্ষক সহ দুই পাড়ের শত শত বাসিন্দা।

৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মিথি খাতুন জানায়, সাঁকোর উপর দিয়ে হাঁটলে কাঁপতে থাকে সাঁকো। তখন ভীষণ ভয় লাগে। কিন্তু স্কুলে তো যেতেই হবে……….….

৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী হোসাইন আহমেদ বলে, বাতাস এলেই সাঁকোটা দুলতে থাকে। মনে হয় একপাশে কাত হয়ে পড়ে যাব। বাঁশে প্রায়ই পা পিছলে যায়। বৃষ্টি হলে পা পিছলে যে কেউ পড়ে যেতে পারে। সাঁতার জানা না থাকলে রয়েছে নিশ্চিত মৃত্যুর আশঙ্কা।

এলাকার বাসিন্দা মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, সাঁকোর নিচে পানি অনেক গভীর। কচুরিপানার কারণে কিছুই দেখা যায় না। বাচ্চারা পড়ে গেলে কোথায় যাবে তখন কেউও বলতে পারবে না।বাচ্চাদের জীবন ঝুঁকিতে রেখে আর কতদিন চলবে ? তাই প্রধান উপদেষ্টা ও শিক্ষা উপদেষ্টা মহোদয়ের নিকট বিশেষভাবে অনুরোধ, একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করে এই কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন রক্ষা করতে তড়িৎ পদক্ষেপ নিন।

এলাকার গৃহবধূ সেলিনা বেগম বলেন, বাচ্চারা প্রতিদিন স্কুলে গেলে পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় হয়। তাই সাঁকো পার না হওয়া পর্যন্ত সাঁকোর কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। আমরা গরীব মানুষ, বাচ্চাদের পড়াতে চাই। কিন্তু এই সাঁকো পারাপারে বাচ্চাদের জীবনের অনেক বড় ঝুঁকি রয়েছে।

 পুঁইবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মোছা: ফাতেমা খাতুন বলেন, পুরাতন নড়বড়ে এই সাঁকো পার হয়ে প্রতিনিয়ত আসা-যাওয়া করা বাচ্চাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন আমরা আতঙ্কে থাকি। একদিন বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী একসাথে উঠতেই পুরাতন সাঁকোটি এমনভাবে কেঁপে উঠেছিল–মনে হচ্ছিল “” এখনই ভেঙে যাবে””।

সহকারী শিক্ষক মো: কামাল হোসেন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষবৃন্দকে বারংবার জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত স্থায়ী পসকা সেতু নির্মাণের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সাঁকো পারাপারে অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ও মৃত্যু ঝুঁকির অজানা আশঙ্কায় অনেক অভিভাবকই ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে পাঠাতে চায় না। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়াতে হলে অবশ্যই একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা ছাড়া “” আমাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ নেই””।

ভাঙ্গুড়া সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগকে জানানো হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

পুঁইবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২০ জন শিশু কে নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে হাসি-খুশি নিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতে দিন। একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণই পারে এই শিশু ছাত্র -ছাত্রীদের ঝুঁকিপূর্ণ পথচলার অবসান ঘটাতে। তাই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কর্তব্যরত প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

You cannot copy content of this page