“টাকা থাকলে সবই হয়” তা আবারো প্রমাণ করলেন দুই সাব রেজিস্ট্রার আবরার ও আরিফুর


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৪, ২০২৫, ১০:৪১ AM /
“টাকা থাকলে সবই হয়” তা আবারো প্রমাণ করলেন দুই সাব রেজিস্ট্রার আবরার ও আরিফুর

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:

টাকা থাকলে এদেশে বাঘের চোখ পাওয়া যায়। সাত রাজার ধন ” মানিক ” আসতে পারে হাতের মুঠোতে। রাতারাতি কালো টাকার বদৌলতে বনে যেতে পারেন ” ডাকসাইটে ব্যক্তিত্বে”। এবার সেই কালোটাকার জোরে সূদুর অখ্যাত অজপাড়াগাঁ ও মফস্বল থেকে সরাসরি রাজধানী ঢাকার রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুটি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দায়িত্ব পেয়েছেন দুর্নীতিবাজ দু’জন সাব রেজিস্ট্রার। এদের একজন আবরার ইবনে রহমান( সূত্রাপুর)অপরজন আরিফুর রহমান(ধানমন্ডি) ।
সাব রেজিস্ট্রার আবরার ইবনে রহমান দেশের উত্তরাঞ্চলের ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সরাসরি রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম টাকার মেশিন হিসেবে খ্যাত সূত্রাপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে।

আর আরিফুর রহমান চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থেকে সরাসরি যোগদান করেছেন রাজধানীতে দুর্নীতির শীর্ষতম খানদানী সাব রেজিস্ট্রার অফিস ধানমন্ডিতে। শুধু বদলি আদেশে এঁদের দু’জনকে রাজধানীতে প্রেরণ করা হয়েছে তা নয়, এর আগে এ দু’জন সাব রেজিস্ট্রারকে বি গ্রেড থেকে ” এ” গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ঘুষ দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্যের অন্যতম হোতা শীর্ষ এ দু’জন সাব রেজিস্ট্রারকে বিভাগীয় পর্যায়ে তিরস্কৃত না করে কীভাবে- কীসের বলে করা হলো ” পুরস্কৃত “?? তা নিয়েও তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সসহ গোটা দেশের অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন সাব রেজিস্ট্রারদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, আলোচনা-সমালোচনা।

আমাদের ঠাকুরগাঁও ও চাঁদপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মফস্বলে লুটপাট ও দলিল বাণিজ্যের টাকায় ওইসব কালোটাকার বদৌলতে নিবন্ধন অধিদপ্তর, দু’জন জেলা রেজিস্ট্রারকে ম্যানেজ ও BSRA এর শীর্ষ দুনেতাকে দিয়ে তদবির করিয়ে হাতিয়ে নেন রাজধানীর সূত্রাপুর সাব রেজিস্ট্রার পদ আবরার ইবনে রহমান। আর ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রার পদ বাগিয়ে নেন আরিফুর রহমান।

কে এই আবরার ???

জানা গেছে, ৩০শে নভেম্বর ১৯৮৮ সালে পাবনায় জন্ম গ্রহণ করেন আবরার ইবনে রহমান। তাঁর পিতার নাম মতিয়ার রহমান। মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান আবরার এমএ পাশ করে বিভিন্ন দপ্তরে চাকরীর জন্য চেষ্টা করতে থাকেন। একপর্যায়ে সাব রেজিস্ট্রার পদে টিকে যান। তার প্রথম পদায়ন হয় পার্শ্ববর্তী জেলা নাটোরের বরাইগ্রাম সাব রেজিস্ট্রার পদে। এরপর ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মানিকগঞ্জে। সেখানেও বরাইগ্রামের ন্যায় ব্যাপক ঘুষ দুর্নীতি ও জাল দলিল বাণিজ্য করে ব্যাপক বিতর্কিত হয়ে পড়েন। তাই আশানুরূপ ফলাফলে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে নিবন্ধন অধিদপ্তরের এক বদলি আদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অখ্যাত অজপাড়াগাঁ ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জে।
মূলত: পীরগঞ্জে কথায় কথায় শ্রেণী পরিবর্তন, ভলিউম টেম্পারিং, এনআইডির ছবি পরিবর্তন, সেরেস্তা খরচের নামে দলিল দাতা গ্রহীতাদের পকেট কাটা, দলিল মূল্যের অনুপাতে লাখে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়ে নামে বেনামে গড়ে তুলেন অঢেল সম্পদের পাহাড়। ওর ওইসব কালোটাকার বদৌলতে নিবন্ধন অধিদপ্তর, দু’জন জেলা রেজিস্ট্রার ও BSRA এর শীর্ষ দুনেতাকে দিয়ে তদবির করিয়ে হাতিয়ে নেন রাজধানীর সূত্রাপুর সাব রেজিস্ট্রার পদ।

কে এই আরিফুর রহমান ???

১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৯১ সালে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন আরিফুর রহমান আরিফ। এমএ পাশ করে সাব রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান ২০১৭ সালে। ওই বছরের ১লা আগস্ট তাঁর প্রথম পদায়ন হয় নর্থবেঙ্গলের কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী সাব রেজিস্ট্রার অফিসে। এরপর তাঁকে বদলি করা হয় শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে। এরপর তাঁকে বদলি করা হয় চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে। চলতি বছরের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শীর্ষতম দুর্নীতিগ্রস্ত সাব রেজিস্ট্রার অফিস ধানমণ্ডিতে অধিষ্ঠিত হন।

ধানমন্ডিতে অনেক আগে থেকে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আস্থাভাজন ও ফেনী দাগনভূঁইয়ার পোলা দৈনিক ৬০ টাকা হাজিরার কোটিপতি উমেদার রানার নেতৃত্বে সক্রিয় এক শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট। ইতোমধ্যে ধানমন্ডি অফিস থেকে ১১ জন সাব রেজিস্ট্রার হয়েছেন বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক। শুধু তাই নয় রানা ও আতাউরের মতো একাধিক উমেদার, সহকারী, নকলনবিশ হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। রানা আতাউরসহ এসব স্টাফদের সকলের রয়েছে রাজধানী ঢাকাতে একাধিক ফ্লাট, প্লট, গ্রামের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি এলাকায় পুকুর, মাছের ঘের, মাঠাল সম্পত্তি, দোকান মার্কেট, পাকা আলিশান বাড়িঘর।

দেশের শীর্ষতম দুর্নীতিগ্রস্ত সাব রেজিস্ট্রি অফিস রাজধানীর ধানমন্ডিতে বর্তমানে বহাল তবিয়তে রয়েছেন আরিফুর রহমান। নিজেকে ধোয়া তুলসীপাতা প্রমাণ করতে সকল ধরণের ঘুষ দুর্নীতি ও দলিল বাণিজ্য চালাচ্ছেন রানার মাধ্যমে।

৬০ টাকা হাজিরার কোটিপতি উমেদার রানার অবৈধ সম্পদের কিঞ্চিৎ বিবরণ:

হাতিরঝিল মহানগর হাউজিংয়ে ৩য় তলায় কেনা ১৮শ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন রানা। এই বিল্ডিংয়ে তার আরো একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া রামপুরা বনশ্রীতে ৪তলা বিলাসবহুল বাড়ির মালিক হয়েছেন রানা। তার গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার দাগনভুঁইয়ায় কিনেছেন প্রায় ৩০ একর জমি ও ৫টি দোকান। শুধু তাই নয় ৩টি হাইয়েছ মাইক্রো কিনে রেন্ট এ কার’এ ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। নিজে বিলাসবহুল প্রাইভেট কারে ও চলাফেরা করে থাকেন উমেদার রানা।

কোনধরনের দলিলে স্বাক্ষর করেন সাব রেজিস্ট্রার আবরার ও আরিফ??

মূলত: দলিল আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে বড় সাহেবের নাস্তা, চা-মিষ্টি, সেরেস্তা খরচ ওনর্মাল দলিল প্রতি অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা থেকে কয়েক লক্ষ টাকা আদায় করে সূত্রাপুর সাব রেজিস্ট্রার এর কথিত সহকারী নকলনবিশ আবুল ও ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রার অফিসে কথিত প্রধান সহকারী কোটিপতি উমেদার রানা যেসব দলিলের মাথায় দেন বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন, সাব রেজিস্ট্রার আবরার ইবনে রহমান ও আরিফুর রহমান সেসব দলিলে স্বাক্ষর করেন চোখ বন্ধ করে খোশমেজাজে।

কখন দলিল প্রতি হয় কোটি টাকার খেলা ??

সিএস, আরএস রেকর্ড ও নামজারি ছাড়ায় যখন দলিল সম্পাদন, ভলিউম টেম্পারিং, নকল এনআইডি কার্ডের অপপ্রয়োগ এবং দাগ নাম্বার পরিবর্তন-পরিমার্জন, এনআইডি কার্ডের বানান ভুল থাকলে আর একজনের জমি আরেক জনের নামে দলিল সম্পাদন করে দিল হয় কোটি টাকার বাণিজ্য। এছাড়া বিভিন্ন ডেভলপার কোম্পানিকে জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে ফ্রেশ নাল ও ভিটি জমিকে পরিত্যক্ত ডোবানালা দেখিয়ে হায়ার ভ্যালু আর আন্ডার ভ্যালুর মারপ্যাঁচে ফেলে হাতিয়ে নেওয়া হয় কোটি কোট টাকা। তবে এক্ষেত্রে সরকার বঞ্চিত হন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে।

এছাড়া এপি( এ্যানিমি প্রোপার্টি), ভিপি ( ভেস্ট প্রোপার্টি) ও বনভূমি বা সড়ক জনপথের জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি করে দিলেও খাস কামরায় চলে কোটি কোটি টাকার হাতবদল।। ( চলবে।

 

এরপর আরো বিস্তারিত পড়ুন দ্বিতীয় পর্বে। সূত্রাপুর ও ধানমন্ডি অফিসের ঘুষ দুর্নীতির একাধিক অডিও ও ভিডিও ক্লিপস্ সহ আমরা আছি আপনাদের পাশে, ঘুষ দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচনে।।

You cannot copy content of this page