

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ যেন গভীর বনাঞ্চলের ন্যায় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। উত্তর বনাঞ্চলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ৪ খলিফারূপী কুশীলবরা বনের মধ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বন ধ্বংসের মহাযজ্ঞে মেতে উঠেছে। সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে প্রকাশ্যে জমি দখলের খেলায় মেতেছে এই ৪ খলিফারূপী ৩ জন রেঞ্জ ফরেস্টার ও ১ জন স্টেশন কর্মকর্তা । এই ৪ খলিফা হলেন, মিরসরাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: আল আমিন, কুমিরা রেঞ্জ কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী, ইছামতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: তৌহিদুর রহমান ও অপরজন স্টেশন কর্মকর্তা মো: ইলিছুর রহমান ধুমঘাট বনশুল্ক ও পরীক্ষণ ফাঁড়ি।
এই দুর্নীতিবাজ ৪ ফলিখা ও স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে উপ বন সংরক্ষক সফিকুল ইসলাম ঘুষ বাণিজ্যে সরব রয়েছেন। তাছাড়া বণাঞ্চলের অধিনে প্রায় সময় দেখা যায় নিয়মনিতী তোয়াক্কা না করে,গাছ কাটা-পাচার, বনে মহিষ বিচরণ, নদীতে অবৈধ ভাবে মাছ আহরণ, নানান প্রকার অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জালে মাছ শিকার, বনের মধু পাচার ও কৃত্তিম বাঁধ সৃষ্টি করে মাছ আহরণ থেকে শুরু করে বনজ ভূমি ব্যবহার করে তরমুজ চাষ সহ সংরক্ষিত বনের জমি গোপন চুক্তিতে লিজ দিয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এসব প্রকাশ্য দুর্নীতি আর লুটপাট বাণিজ্যের সংবাদ প্রকাশ হলেও দৃশ্যমান আইনি হস্তক্ষেপের কোনো নজির নেই। শুধুমাত্র উপ বন সংরক্ষক সফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত নোট বুকে ঠাঁই পাওয়া এসব অভিযোগ রহস্যজনক কারণে একসময় চাপা পড়ে যায়।

বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে একাধিক সংবাদকর্মী বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে অবহিত করলেও মেলেনি কোন প্রতিকার। সব সময় চুপচাপ থেকে দায় এড়াতে চান শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাই দিন শেষে উপ বন সংরক্ষক সফিকুল ইসলামের ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠা অবজ্ঞার হাসি পৌঁছে যায় দুই কানের সীমানায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের হাত থেকে বাঁচতে বনের মূলবান গাছ কেটে আশপাশের পুকুর ও মাছের ঘেরে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। কাটা গাছের গোড়া কখনো মাটিচাপা দেয়া হয়েছে, আবার কখনো শেকড় দিয়ে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবাদ করলে ফাঁসানোর জন্য তাদের পুকুর কিংবা ঘেরে ফেলে রাখা হচ্ছে কাটা গাছের অংশ। আবার কখনো দেয়া হচ্ছে মিথ্যা মামলা। স্থানীয় এক মৎস্য ব্যবসায়ী বলেন, এই সংরক্ষিত বন আমাদের ঢাল স্বরূপ। এটি না থাকলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবো। অথচ বিট অফিসার ও রেইঞ্জ অফিসার এবং বনখেকো চক্র মিলে মিশে ধীরে ধীরে এই বনাঞ্চল শেষ করে দিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, উপ বন সংরক্ষক সফিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে আসার পর তিনি ঘুষ আর দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন এই উত্তর বন বিভাগকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী বলেন, কাগজে কলমে নাম মাত্র ইজার জমা হলেও মোটা অংকের টাকা দিতে হয় কোন রকম লিখিত চুক্তি ছাড়া। তা না হলে মোটা অংকের টাকায় বহিরাগতদের দেয়া হয় ইজারা, যার ফলে প্রতি বছর মোটা টাকা খাজনা দিয়ে আমাদের মহিষ গরু মাঠে বিচরণ করাতে হয় । এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, বিট অফিসার ও রেঞ্জ অফিসারের মন মতন টাকা না দিলে খালে মাছ শিকার করতে বাঁধা দেয়া থেকে মামলা পর্যন্ত খেতে হয় আমাদের । তিনি আরও বলেন অধিক সময় একই স্থানে থাকার ফলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চেনা জানা বেড়ে যাওয়ার ফলে আমাদের মতন সাধারণ জেলেদেরকে তারা সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। তাই বাধ্য হয়ে বিভিন্ন স্তরকে টাকা দিতে হয় না দিলে ছেলে মেয়েদের নিয়ে থাকতে হয় খালি পেটে । মাঝে মধ্যে দু একটা বিষয়ে লোক মুখে প্রচার হয়ে তা জনসুমক্ষে আসলেও কাগজ গোপন তদবিরে থেমে যায়।
সম্প্রতি সময়ে বন উজার করে বনের ভিতর ভেকু দিয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে মাটি কেটে ঘের তৈরির অভিযোগ উঠে স্থানীয় এক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। যা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশ পায়। এলাকাবাসীর মতে, আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় প্রথমে ঘের করেছিলেন জুয়েল সিকদার, এখন বিএনপির ছত্রছায়ায় থেকে বনের জমি দখল করে নতুন বাঁধ নির্মাণ করছেন তিনি। ঘেরের পানি নিষ্কাশনের জন্য বনের মধ্যে ভেকু মেশিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে নালা ও কালভার্ট। ঘের মালিক ইসমাইল মাঝির ভাই মামুন মাঝি বলেন, ২০২০ সালে ঘের করার সময় দেড় একর বনভূমি দখল করা হয়েছিল। এ বছরও নতুন করে ৩০-৪০ ফুট বনভূমির ভেতরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এভাবেই্ ধীরে ধীরে বন উজাড় হচ্ছে রেঞ্জ অফিসার না জানলে কি এটা করা সম্ভব হতো ??

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭০-৮০ দশকে গড়ে ওঠা এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, পশু-পাখির আশ্রয়স্থল এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া একই স্থানে বহুদিন কর্মরত থাকার কারণে স্থানীয় বলয় ও চেনা জানা হওয়াতে অপরাধের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলার আশংকা থাকে, তাই স্থান কাল হিসাবে নির্দিষ্ট সময়ের পর কাওকেই একই স্থানে রাখা ঠিক নয়।
খোঁজনিয়ে জানা যায়,উপ বন সংরক্ষক সব সময় নানান কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন যাতে করে বিভাগী বন কর্মকর্তা ও প্রধান বন সংরক্ষকের স্নেহভাজন হয়ে সব সময় নিজেকে দোষ ত্রুটির হাত থেকে দূরে রাখতে পারেন।
গুঞ্জন চলে সাধারণ স্টাফ ও কর্মচারীদের মুখে। বিভিন্ সময়ে এ রেঞ্জে ঘটে যাওয়া নানান অনিয়মের বিষয়ে রাঙ্গাবালী রেঞ্জ অফিসার এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন প্রকার কথা বা দেখা করতে চাননি।।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ যেন গভীর বনের মতোই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এই সেক্টরে দুর্নীতি ও লুটপাট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তা সহজে প্রকাশ পায় না। সুফল প্রকল্প, বনায়ন প্রকল্প কিংবা রাজস্ব খাতের বরাদ্দের টাকা কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। রেঞ্জ কর্মকর্তা, স্টেশন কর্মকর্তা ও বিভাগীয় কর্মকর্তারা ঘুষের মাধ্যমে পোস্টিং নিয়ে জবরদখলে সরাসরি সহযোগিতার করায় সংকুচিত হচ্ছে বনভূমি, নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী এবং অভয়ারণ্য হারিয়ে গেছে। বিলুপ্ত প্রজাতির প্রায় শতাধিক প্রাণী চরম সংকটে পড়েছে পরিবেশ ও প্রকৃতি।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিলেও উল্লিখিত ৪ খলিফার সিন্ডিকেট ও উপ বন সংরক্ষক সফিকুল ইসলামের আস্থাভাজন কিছুসংখ্যক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারির কারণে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। স্বয়ং দেশের প্রধান উপদেষ্টা ও পরিবেশ উপদেষ্টা এসব দুর্নীতিবাজদের উদ্দেশ্যে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরও কোনো কিছুতেই তা কাজে আসছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রশংসিত হলেও দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে সুশাসন আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ সফল বনায়নকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে বন অধিদপ্তরের অভাবনীয় সাফল্য আজ ম্লান হতে চলেছে কিছুসংখ্যক দুর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তা/কর্মচারিদের জন্য। এমনই একজন উপ বন সংরক্ষক সফিকুল ইসলাম ও তার ৪ কুশীলব।
অবৈধ অর্থের জোরে একটি বিশেষ মহলকে ‘খুশি’ করে সম্প্রতি তিনি চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে পোস্টিং নিয়েছেন। প্রজাতন্ত্রের এ কর্মচারি তার পদ-পদবীর অপব্যবহার করে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করছে উপ বন সংরক্ষক সফিকুল ইসলাম গং।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকলেও বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকেন তিনি। এ ঘটনায় জেলার বনকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে, কথায় আছে “”রক্ষক যখন ভক্ষক তখন বন রক্ষা করবে কে”” ? রাতের আঁধারে অসৎ বন কমকর্তা দিয়ে বনে থাকা বহু বছরের পুরোনো গাছ কাটা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। টাকার লোভে এভাবে বন কাটায় হতবাক স্থানীয়রাও। বন উজাড়ের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ সংবাদ সংগ্রহে গেলে বিভিন্ন হুমকি ধামকি দেন বন কমকর্তারা। উপ বন সংরক্ষক সফিকুল ইসলাম বনের মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করেছেন এবং বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করেছেন শুরু থেকেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত বন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সফিকুল ইসলাম বনের গাছ কেটে পাচার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন। নামে বেনামে গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। সফিকুল গং বিভিন্ন প্রকল্পের অনুমোদন এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য তারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে অভিযোগ করে আসছি, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি। বন বিভাগের কিছু অসাধু বন কর্মকর্তার যোগসাজগে এই দুর্নীতি চলছে।”
অভিযোগের বিষয়ে রেঞ্জ কমকর্তা এর কাছে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে, বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়ে তারা অবগত আছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন সঠিক ভাবে তদন্ত করবে এবং ” অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে দেখবে এবং দ্রুত তদন্ত শুরু করা হবে। দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বন মন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা যায় এবং বনভূমি রক্ষার পাশাপাশি সরকারি সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরী।।
বিস্তারিত আরও জানতে আমাদের সাথে থাকুন। চোখ রাখুন প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে।
www.ajkerpaperbd.com






















You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :