
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রংপুর–১ ( গংগাচড়া ও রংপুর সিটি করপোরেশনের আংশিক এলাকা ) এখন নির্বাচনী আমেজে মুখর। প্রধান ৪ প্রার্থীর সক্রিয় প্রচারণা ও মাঠ–পর্যায়ের তৎপরতায় দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। ছোট-বড় মিছিল, পথসভা, খোলাবৈঠক, মতবিনিময়—সব মিলিয়ে নির্বাচনী এলাকাজুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজন,
জাতীয় পার্টির অঘোষিত প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলী,
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত প্রার্থী অধ্যাপক রায়হান সিরাজী এবং
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠাতা রেজাউল করিম।
৪ জনই ভোটারদের মন জয় করতে দিন-রাত প্রচারণায় ব্যস্ত।
বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী হওয়া মোকাররম হোসেন সুজন অতীত স্থানীয় নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে এলাকায় পরিচিত নাম। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও পরে পদত্যাগ করেন।
গংগাচড়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “একসময় এ আসন জাতীয় পার্টির ঘাঁটি ছিল“। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও জাতীয় পরিস্থিতির কারণে ভোটের সমীকরণ বদলেছে। গংগাচড়ার মানুষ পরিবর্তন চায়। আমি নির্বাচিত হলে গংগাচড়াকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তর করব এবং মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা ও ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করব।”
তিনি আরও জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করছেন এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে।
জাতীয় পার্টির অঘোষিত প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলী মাঠে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দলীয় মনোনয়ন পান কি না—তা নির্বিশেষে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
তাঁর ভাষ্য,“গংগাচড়ার মানুষের উন্নয়নে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। কেউ যেন অনাহারে না থাকে এবং এলাকায় কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়—সেজন্য কাজ করছি। তিস্তা নদীভিত্তিক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং পানি ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আনাও আমার অগ্রাধিকার।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণ তার উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি ও দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি এ আসনে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও শিক্ষা–অনুরাগী ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক রায়হান সিরাজীর নাম। স্থানীয় অনেকের মন্তব্য, দীর্ঘদিন পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য থেকে প্রার্থী পাওয়ায় এলাকায় নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক গোলাম রব্বানী জানান, এটি দলের প্রাথমিক বাছাইয়ের ফলাফল; তফসিল ঘোষণার পর কেন্দ্রীয়ভাবে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
অধ্যাপক রায়হান সিরাজী প্রতিবেদককে বলেন, “মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিচ্ছে তা আমার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নির্বাচিত হলে এলাকার সেবা-প্রত্যাশী মানুষের পাশে থাকব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে থাকব এবং গংগাচড়ার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করব।
এদিকে এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, গংগাচড়ার পরিচিত সমাজসেবক ও বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠাতা রেজাউল করিম।
তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। নির্বাচিত হলে গংগাচড়াকে একটি মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলব এবং সেবামুখী প্রশাসন নিশ্চিত করব।নির্বাচনী মাঠে তাঁর নীরব দাপট সাধারণ ভোটারদের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভোটের সমীকরণে বহু পরিবর্তন হয়েছে, রংপুর–১ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস বহু উত্থান–পতনের সাক্ষী। ১৯৯১ সালে এই আসনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জয়ী হলেও পরবর্তী উপনির্বাচনে করিম উদ্দিন ভরসা নির্বাচিত হন।
২০০৮-এর পর বিভিন্ন নির্বাচনে দলীয় জোট, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, স্থানীয় ইস্যু ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভোটের ফলাফলে বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
১৯৭৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি ৬ বার, আওয়ামী লীগ ২ বার এবং বিএনপি ১ বার নির্বাচিত হয়েছে। অনেকের মতে, নির্বাচনের নিয়মিত পরিবর্তিত চিত্র গংগাচড়ার রাজনীতিকে সবসময় উত্তপ্ত রেখেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের ঘাটতি থাকায় এলাকার মানুষের প্রত্যাশা এবার অনেক বেশি। নতুন নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, তিস্তা নদীশাসন—এসব বিষয় ভোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আগামী নির্বাচন নিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে শঙ্কা থাকলেও প্রার্থীদের সক্রিয় প্রচারণা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন চায়ের দোকান, বাজার, হাট—সবখানেই চলছে ভোটের বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানান অনেক ভোটার।
কার জনপ্রিয়তা কতটা, কে এগিয়ে—তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। ফলে গংগাচড়া আসনটি এখন রাজনৈতিকভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
রংপুর–১ আসনে চার প্রার্থীর প্রচারণা, স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক উত্তাপ—সব মিলিয়ে সামনে একটি জমজমাট, প্রতিযোগিতামূলক ও প্রাণবন্ত নির্বাচনী লড়াই দেখা যাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তবে এই উপজেলায় ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ থাকলেও বর্তমানে ৫ ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান এর পদ শূন্য রয়েছে, বাকি ৪ টি সক্রিয়। এসব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান না থাকায় অত্র উপজেলা ঘিরে জনসেবার ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এরকম অবস্থায় জাতীয় নির্বাচন বাস্তবায়নে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।





















You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :