গাজীপুর BRTA অফিস “” নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতা শূন্য “”


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১১, ২০২৫, ৮:২২ AM /
গাজীপুর BRTA অফিস “” নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতা শূন্য “”

“দালালরাই BRTA গাজীপুরের প্রাণভোমরা”

 

সজীব আকবর, অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:

গাজীপুর বিআরটিএ অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয়না। এখানে আমজনতার পকেট কাটতে সদা তৎপর সহকারী পরিচালক ( ইঞ্জিন:) এস এম মাহফুজুর রহমান ও মোটরযান পরিদর্শক নাসিরুল আরিফিনের নেতৃত্বাধীন দু’ডজন সক্রিয় দালাল। দালালরাই এখানে “প্রাণভোমরা”। দালালদের হাত ধরেই প্রতিমাসে সহকারী পরিচালক, মোটরযান পরিদর্শক ও অফিস স্টাফদের মধ্যে পদপদবী অনুযায়ী ভাগ-বাঁটোয়ারা হয় কোটি টাকা।

টঙ্গীর দত্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা মকবুল হোসেনের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক পেশায় ট্রাকচালক। ছয় মাস ধরে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য গাজীপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অফিসে ছোটাছুটি করছেন, কিন্তু লাইসেন্স করতে পারছেন না। গতকাল বুধবার সকালে তাঁর সঙ্গে কথা হয় বিআরটিএ অফিসের সামনে। তিনি বলেন, ছবি ও আঙুলের ছাপ ( ফিঙ্গারপ্রিন্ট ) দিয়েছেন। তবে অনেক দিন চেষ্টা করেও লাইসেন্স করতে পারছেন না। এক দালালকে ৮ হাজার টাকা দিয়েছিলেন কিন্তু সেই দালাল এখন লাপাত্তা। পরে বাধ্য হয়ে মোটরযান পরিদর্শক নাসিরুল আরিফিন সাহেবকে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা দিয়ে তিনি এখন কিছুটা টেনশন মুক্ত।

লাইসেন্স করতে আসা বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের প্রায় সবার অভিযোগ, লাইসেন্স করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে এবং সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা ঘুষ না দিলে কোনো কাজই হচ্ছে না। অভিযোগ করে তাঁরা বলেন, চাহিদামতো ঘুষ না দিলে কিংবা দালাল ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে লাইসেন্স প্রত্যাশীদের। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং ফিল্ড (মাঠ) টেস্টে পাস করার পর নির্ধারিত ফি জমা পর্যন্ত চলে ঘুষের কারবার। আবার লিখিত পরীক্ষায় ফেল করলেও কর্মকর্তাদের সুপারিশ হলে দিতে হয় না মৌখিক পরীক্ষা ও ফিল্ড টেস্ট।

বিআরটিএ গাজীপুর কার্যালয়ে ভোগান্তির শেষ নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে একাধিকবার ধরনা দিতে হয় বিআরটিএ অফিসে। টাকা ছাড়া মেলে না গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট। দালাল ধরে টাকা দিলে পরীক্ষা ছাড়াই মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গাজীপুর জেলা কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত একাধিক অভিযানে লাইসেন্স, যানবাহন নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন ও ফিটনেস সনদ প্রদানে ঘুষ লেনদেনসহ নানা অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে বহুবার। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে “আজকের পেপার” সহ কয়েকটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ হতে থাকলে বিতর্ক এড়াতে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও পরিদর্শক সায়েদুল ইসলাম সুমনকে সড়িয়ে দেয়৷ পরিবর্তে পিরোজপুর ঝালকাঠি থেকে ২৫ শে জুলাই উড়িয়ে আনা হয় এস এম মাহফুজুর রহমানকে। এর ঠিক ১০ দিন পরে যোগ দেন মোটরযান পরিদর্শক নাসিরুল আরিফিন। তবে কর্মকর্তা বদল হলেও BRTA গাজীপুর সার্কেলের চিত্র ” যথা পূর্বং তথা পরং  ।। বরং ঘুষ দুর্নীতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে বিআরটিএ’র “ভরাহাট” হিসেবে খ্যাত এই শুষ্ক মৌসুমে।

মহানগরের গাছা এলাকা থেকে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে আসেন আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘টাকা দিয়ে মোমিন নামের এক দালালের সঙ্গে চুক্তি করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আপনি আঙুলের ছাপ আর ছবি তুলে বাড়ি চলে যান, সময়মতো লাইসেন্স পেয়ে যাবেন। তাঁকে ১২ হাজার টাকা দিয়ে এখন হাসিমুখে বাড়ি চলে যাচ্ছি।’ তবে শেষ পর্যন্ত এই হাসি অম্লান থাকবে কি-না তা নিশ্চিত নয়।

ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অভিযোগ, বিআরটিএ গাজীপুর সার্কেলে সক্রিয় আছেন কমপক্ষে ২৫ থেকে ২৬ জন সক্রিয় দালাল
গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকার বাসিন্দা কবির বলেন, ‘আমি একটি অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য আসছিলাম। কিছু বুঝতেছিলাম না। পরে বিআরটিএ অফিসের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে এক দালালকে পেয়ে যাই। সেই দালাল ভাইয়ের সঙ্গে দেখলাম BRTA স্যারদের সাথে খুব ভালো সুসম্পর্ক। তাই সেই দালাল ভাইয়ের সঙ্গে ১০ হাজার টাকা দিয়ে চুক্তি করেছি।’

কিছুদিন আগে লাইসেন্স করার একটি আবেদন ফরম নিয়ে প্রথম আলোর একজন প্রতিবেদক গাজীপুর বিআরটিএ অফিসে গেলে রুহুল আমিন নামের এক দালাল প্রতিবেদকের কাছে এসে কথা বলতে শুরু করেন। কিছু সময় পর তিনি বলেন, ‘আপনি অপেশাদার লাইসেন্স করতে চাইলে ৮ হাজার টাকা দিয়ে ছবি ও আঙুলের ছাপ দিয়ে চলে যান। আপনার লাইসেন্স হয়ে যাবে।’ এরপর একে একে আরও বেশ কয়েকজন দালাল এসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চান লাইসেন্স করে দেওয়ার জন্য। তাঁদের কাছে লাইসেন্স প্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে দালালরা বলেন, অফিসের কর্মকর্তা মাহফুজ স্যার ও আরিফিন স্যারের মাধ্যমে আমরা গ্যারান্টিসহ লাইসেন্স করে দিই, কোনো সমস্যা নেই। প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য দালালরা কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেন বলে তারা অপকটে স্বীকার করেন।

বিআরটিএ গাজীপুর সার্কেলের বর্তমানে সবকিছু অনলাইনে হয়। টাকা জমা হয় ব্যাংকে, ম্যানুয়ালি কিছু করা হয় না। এসব কথা সবসময় প্রচার দেয়া হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্নি। অনলাইন সিস্টেম এখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স,ফিটনেস সনদ, মালিকানা বদল, রোড পারমিটসহ সকল কাজ এখানে হয় দু’ডজন চিহ্নিত দালালের হাত ধরে ম্যানুয়াল সিস্টেমে। দালালদের সাথে AD এস এম মাহফুজুর রহমানমোটরযান পরিদর্শক নাসিরুল আরিফিনের সু সম্পর্ক প্রমাণ করে ” দালালরাই গাজীপুর বিআরটিএ’র প্রাণভোমরা ” কারণ প্রতিমাসে এসব দালালদের দাত দিয়েই কর্মকর্তাদের পকেটে ঢুকছে কোটি টাকা। তাই দালালদের জন্যই নিশ্চিন্ত আয়েসি জীবনযাপনের পথ প্রশস্ত হচ্ছে কর্মকর্তাদের।। ভাব খানা এমন “” নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতা শূন্য “”!!!!

You cannot copy content of this page