
ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
দুবাইয়ে এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে এফ-৪০ জ্যাভলিন থ্রো ইভেন্টে ৯ দশমিক ৪৫ মিটার দূরত্বে ছুড়ে স্বর্ণপদক এবং ১০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক জিতে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশের সোনালী চৈতী রানী দেব। এছাড়া আরো একটি স্বর্ণ ও ব্রোঞ্জ পদক জিতে বাংলাদেশের শারীরিক প্রতিবন্ধী দলটি। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টায় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে চড়ে দুবাই থেকে আসেন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এরপর তাদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করা হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা থেকে বাসযোগে নিজ জন্মভূমি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নের ভুনবীর গ্রামে পৌছেন এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে দেশের পক্ষে দুটি ইভেন্টে স্বর্ণপদক জয়ী ১৩ বছরের বালিকা চৈতী রানী দেব। রাতেই এবং মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সারাদিন এলাকাবাসী, তার নিজ বিদ্যালয় এবং বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করেন ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার চৈতী রানী দেবকে।
বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী এম এল এইচ লোকমান বলেন, “চৈতী রানী দেব আমার নিকটতম প্রতিবেশী। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর দশরথ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ভূনবীর গ্রামের সত্য দেব ও শিলু রানী দেব দম্পত্তির মেয়ে চৈতীর জাতীয় পর্যায়ের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সাফল্যে সারাদেশের মত আমরা ভূনবীরবাসীও গর্বিত। এই সাফল্যের পেছনে তার পিতা-মাতা স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা, খেলার কোচসহ সংশ্লিষ্টদের অক্লান্ত শ্রম ও সহযোগিতা মাধ্যমেই কেবল এত বড় সাফল্য সম্ভব হয়েছে।”
“স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইন্ডিপেনডেন্স (SHI)” নামের একটি সংগঠনের মাধ্যমে শারীরিক প্রতিবন্ধী চৈতী রানী দেবের এ্যাথলেটিক্স ময়দানে পদচারণা শুরু। ওই সংগঠনের প্রশিক্ষক বাগেরহাটের সন্তান দেব প্রসাদ শীল। চৈতীকে স্কুলের মাঠ থেকে গড়ে তুলে বিশ্বমঞ্চে পৌছে দিয়েছেন তিনি। দেব প্রসাদ শীল বলেন, “প্রথম পরিচয়ের পরই দেখেছিলাম তার মধ্যে সাফল্যের ক্ষুধা কাজ করে। চৈতি অন্যদের মতো নয়। কিন্তু অন্যদের চেয়ে শক্ত। আমি প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম, কীভাবে তাকে নিয়ে কাজ করবো। পরে দেখলাম, চৈতি প্র্যাকটিস করলে কেউ তাকে আটকে রাখতে পারে না। সে একটানা ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট পর্যন্ত জগিং করতে পারে। মাত্র কয়েক মাসের প্রশিক্ষণে জাতীয় পর্যায়ে দৌড় প্রতিযোগিতায় সে চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর দুবাইয়ে দুটি ইভেন্টে এশিয়ার অসংখ্য প্রতিযোগিকে টপকে সে স্বর্ণপদক লাভ করে দেশকে গৌরবান্বিত করেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্বিত।”
চৈতীর বাবা সত্য দেব বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী মেয়ে এখন দেশের জন্য আন্তর্জাতিক খেলায় লড়াই করে পদক ছিনিয়ে আনছে, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। আমরা কতটুকু খুশি হয়েছি তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমার মেয়েটার জন্য সবাই দোয়া আশীর্বাদ করবেন।”
চৈতীর বিদ্যালয় ভুনবীর দশরথ হাই স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ঝলক চক্রবর্তী বলেন, “দুবাই ২০২৫ এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে আমাদের বিদ্যালয়ের অস্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী চৈতী রানী দেব অসামান্য প্রতিভা দেখিয়ে দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। তার এই সাফল্য বাংলাদেশের প্যারালিম্পিক অগ্রযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাকে নিয়ে আমরা গর্বিত। তার স্বর্ণপদক প্রাপ্তির পর থেকেই আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইতে থাকে। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) রাতে চৈতী নিজ বাড়িতে ফেরার পর মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) বিকেলে আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর সমন্বয়ে দেশের গর্ব চৈতী রানী দেবকে সংবর্ধণা প্রদান করেছি। তার এই সাফল্যের ধারা বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স মঞ্চে অব্যাহত থাকুক যে প্রত্যাশা করছি।”
চৈতী রানী দেব তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমার এই অর্জন দেশবাসীসহ এলাকাবাসীকে উৎসর্গ করেছি। সামনে আমিদেশের পক্ষে খেলতে জাপান যাব। সবাই দোয়া ও আশীর্বাদ করবেন আমি যেন দেশের পতাকাকে আবারও বিশ্বমঞ্চে উত্তোলন করাতে পারি।”






















You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :