
নিজস্ব প্রতিবেক:
‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উন্মত্ততা থেকে পরিত্রাণ পায়নি ব্রিটিশ ভারতও। জাপানি আগ্রাসী বাহিনী মিয়ানমারের সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছিল। সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ আসামে পৌঁছেছিল। ঠিক এ সময়ই বেগম খালেদা জিয়া উত্তরবঙ্গের একটি ছায়া-সুনিবিড় জেলা শহর দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক ডাক্তার প্রস্তাব করেছিলেন নবাগত শিশুটির নাম “শান্তি” রাখা হোক, যাতে লাগাতার ধ্বংসযজ্ঞের পর শান্তির আমেজ পাওয়া যায়।’
প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তাঁর ‘বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম’ শীর্ষক বইয়ে এভাবেই বর্ণনা করেছেন খালেদা জিয়ার জন্মের সময়টি। ওই বইয়ের ‘দিনাজপুর থেকে ঢাকা’ শিরোনামের প্রথম অধ্যায়ে খালেদা জিয়ার নামকরণের বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, ‘… কিন্তু শিশুটি পুতুলের মতো কমনীয় ও সুন্দর হওয়ায় সবাই তাকে “পুতুল” নামে ডাকতে পছন্দ করতেন।’ ওই বইয়ে উল্লেখ করা হয়, নামটি দিয়েছিলেন বড় বোন সেলিমা ইসলাম। সবার বড় বোন খুরশিদ জাহান ‘টিপসি’ বলে ডাকতেন, যদিও পরে এ নামে কেউ আর তাঁকে ডাকতেন না। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম রাখা হয় খালেদা খানম।
মহিউদ্দিন আহমদের ‘খালেদা’ বইয়েও পাওয়া যায়, ‘শান্তি’ নাম রাখার প্রস্তাব ও ‘পুতুল’ নামকরণের গল্পটি। ওই বইয়ের ‘মা–বাবার মুখে মেয়ের কথা’ অধ্যায়ে বলা হয়, খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালের ১ এপ্রিল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। এরপর মাসিক ‘নিপুণ’ পত্রিকায় খালেদা জিয়ার মা-বাবার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। ওই সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়ার বাবা এস্কান্দার মজুমদার বলেন, ‘আমাদের হাউস ফিজিশিয়ান ছিলেন অবনী গোস্বামী। তিনি বলেছিলেন, আপনার এই মেয়ে খুব ভাগ্যবতী হবে। তাঁর নাম আপনারা “শান্তি” রাখুন। সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কারণে সেটা সম্ভব ছিল না। তাই ডাকনাম রাখলাম পুতুল। খালেদা ছিল সবার আদরের। দেখতে–শুনতেও সবার চেয়ে ভালো ছিল। সে জন্য আমরা পুতুল বলেই ডাকতাম।’
বিএনপির সদ্য প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামকরণ, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে ও রাজনীতিতে দাপটের সঙ্গে বিচরণের অনেক তথ্য পাওয়া যায় বিভিন্ন ব্যক্তির লেখায়।
খালেদা জিয়ার বাবা এস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ওই সময়ের নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা, যা বর্তমানের ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলা। এস্কান্দার মজুমদার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯১৯ সালে তাঁর বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে ভারতের জলপাইগুড়িতে থাকতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে প্রথমে চা–বাগানে চাকরি করেন ও পরে চাকরি ছেড়ে চায়ের ব্যবসা শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি জলপাইগুড়ির ‘চা–বাগান সমিতি’র সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেখানে ১৯৩৭ সালে তাঁর বিয়ে হয় তৈয়বা খাতুনের সঙ্গে। তৈয়বা খাতুন পঞ্চগড়ের মেয়ে ছিলেন। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে স্থায়ী হন।
এবার আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পৈতৃক নিবাস দিনাজপুর–৩ আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। পাশাপাশি বগুড়া–৭ ও ফেনী–১ আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। এর আগে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দাদাবাড়ি ফেনী, শ্বশুরবাড়ি বগুড়াসহ, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি কখনো কোনো আসনে হারেননি। দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে খালেদা জিয়াই একমাত্র উদাহরণ, যিনি ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৫টি সংসদ নির্বাচনে ২৩টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতে বিজয়ী হয়েছিলেন।
শখ ছিল ফুলের বাগান করা
যে দুটি বইয়ের কথা শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে খালেদা জিয়ার ছোটবেলা ও তাঁর শখের কথাও উঠে এসেছে। খালেদা জিয়া দূরন্ত ছিলেন এবং বড় বোনের সঙ্গে হইহুল্লোড় করতে পছন্দ করতেন উল্লেখ করে সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর বইয়ে বলা হয়, খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর বোন সেলিমার খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। সেকালের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো তাঁরা দুজনও একই বিছানায় থাকতেন। খালেদা জিয়ার চুল অনেক লম্বা ছিল এবং গোসল করার পর চুল শুকানো তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে যেত। বাড়ির বাইরে কোথাও যাওয়ার সময় মা তাঁর চুল বেঁধে দিতেন। চাচাতো বোন নার্গিসের সঙ্গে তিনি খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁরা দুজনেই স্কুলে নাচ শিখতেন।
দুটি বইয়ে খালেদা জিয়ার ফুলপ্রীতির কথা উঠে এসেছে। ১৯৮৩ সালের মার্চে নিপুণ পত্রিকায় ‘খালেদা জিয়ার দিনকাল’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়। সেই সংখ্যায় আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের তোলা খালেদা জিয়ার একক ছবি এবং দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে ছবি ছাপা হয়।
মহিউদ্দিন আহমদের ‘খালেদা’ বইয়ে বলা হয়, সেটি প্রথাগত সাক্ষাৎকার ছিল না; কারণ, খালেদা জিয়া সাক্ষাৎকার দিতে রাজি ছিলেন না। কিছুটা আলাপ তাতে উঠে আসে। খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আগে আমার হবি (শখ) ছিল ফুলের বাগান করা। ফুল সংগ্রহ করা এখনো আমার হবি। যতবার বিদেশে গিয়েছি, অনেকে আমাকে অনেক কিছু উপহার দিয়েছে। আমি সবকিছু ছেড়ে শুধু ফুলটাই সংগ্রহে রেখেছি। ফুল আমার খুব ভালো লাগে।’
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে
তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়া সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। খালেদা জিয়ার মায়ের চাচাতো বোন ছিলেন জিয়াউর রহমানের মা। সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর বইয়ে পাওয়া যায়, খালেদাকে পারিবারিক আবহে জিয়াউর রহমান দেখেছিলেন এবং খুব পছন্দ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান বিয়ের ব্যাপারে বাবার সম্মতি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তাঁর বাবা ওই সময় করাচিতে ছিলেন। তিনি বিয়ের সম্মতি দিয়েছিলেন, তবে বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
বিয়ের বছরখানিক আগে জিয়াউর রহমানের মাও মারা গিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বিয়ের ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন জিয়াউর রহমানের নানা মকবুল আহমেদ। ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট শুক্রবার দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় খালেদা জিয়ার পিত্রালয়ে বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়ের দিন খালেদা জিয়া মায়ের লাল বেনারসি শাড়ি পরেন। বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল সাদামাটা।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে পা রাখেন খালেদা জিয়া। তারপর আমৃত্যু বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন তিনি। তারপর আমৃত্যু বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন তিনি।
তবে বিয়ে নিয়ে একটু ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায় মহিউদ্দিন আহমদের বইয়ে। সেখানে তিনি জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা জমির উদ্দিন সরকারের লেখা ‘দ্য পলিটিক্যাল থট অব তারেক রহমান’ (তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাবনা) শিরোনামের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, তিন বোনের মধ্যে খালেদা সবচেয়ে সুন্দর। ওই সময় বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার ঘরে ঘরে তাঁকে নিয়ে একটা খবর রটেছিল: একদিন এক ঘটক এক পাত্রীর সন্ধান নিয়ে গেলেন জিয়াউর রহমানের কাছে। জিয়াকে তিনি বললেন, ‘আপনি যদি তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হন, তাহলে আপনার বাড়িতে বিজলিবাতির দরকার হবে না। পাত্রী এত রূপসী যে তাঁর রূপের ছটায় সব অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।’ জিয়া হাসলেন এবং বিয়ে করতে সম্মত হলেন। তারপর দুজন সুখের নীড় বাঁধলেন।’
বিয়ের সময় খালেদা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। জিয়া ও খালেদা প্রথম চার বছরের দাম্পত্য জীবন দিনাজপুরে কাটিয়েছিলেন।
‘দেশে শান্তি আসুক, এটাই চাই’
দুটি বই থেকে জানা যায়, বিপথগামী কিছু সেনা কর্মকর্তার হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি করেছিলেন বাবা ও ভাই (সাঈদ এস্কান্দার)। খালেদা জিয়া রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন মূলত বিএনপির নেতা–কর্মীদের অনুরোধে। তবে মা তাঁকে সমর্থন দিয়েছিলেন।
১৯৮২ সালে রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার তখন উন্মেষকাল। বিজয় দিবসে বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দেন তিনি।
মাসিক ‘নিপুণ’–এ প্রকাশিত বাবা এস্কান্দার মজুমদারের সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করে ‘খালেদা’ শীর্ষক বইয়ে বলা হয়, তিনি মেয়ে খালেদা জিয়াকে বলেছিলেন, ‘মা, যদ্দুর এগিয়েছ, এগিয়েছ। এখন ছেড়ে দাও। সে (খালেদা) বলেছে, এখন আমি যেভাবে নেমেছি, এইভাবে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব না। এগিয়ে যাই যতটা হয়, যদি সত্যিকারের ডেমোক্রেসি (গণতন্ত্র) আসে, আমি আমার কোনো পজিশন (পদ) চাই না। দেশে সুখ শান্তি আসুক, এটাই চাই। দেশে বড় একটা কেউকেটা হয়ে থাকতে চাই না। এখন দেখি আল্লাহ কোন পথে নেয়।’
আর এর পরের ইতিহাস তো দেশবাসী সকলেই জানেন।। এমন একজন দূরদর্শী মানুষ হয়তো এদেশে দেশে সম্ভবত আর কখনো আসবেনা। তবুও অপেক্ষায় থাকি। আমরা চাই তিনি বারবার ফিরে আসুন আবহমান গ্রাম বাংলার স্নিগ্ধ শ্যামল পটভূমিতে কন্যা জায়া জননী রূপে।।






















You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :