কাপাসিয়ায় ফসলি জমির টপ সয়েল লুট: অবৈধ ইটভাটায় যাচ্ছে মাটি, বিধ্বস্ত গ্রামীণ সড়ক


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২, ২০২৬, ২:৪৯ PM /
কাপাসিয়ায় ফসলি জমির টপ সয়েল লুট: অবৈধ ইটভাটায় যাচ্ছে মাটি, বিধ্বস্ত গ্রামীণ সড়ক

মাহাবুর রহমান, কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি:

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় বেআইনিভাবে ফসলি জমির টপ সয়েলের মাটি কেটে বিভিন্ন অবৈধ ইটভাটায় সরবরাহ ও বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। ট্রাক ও ট্রলিযোগে এসব মাটি পরিবহন করায় ছোট-বড় গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে এসব সড়ক দিয়ে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, কাপাসিয়ার ছয়টি ইউনিয়নের অন্তত ৩১টি ইটভাটায় আইন বহির্ভূতভাবে মাটি সরবরাহ করে ইট প্রস্তুত ও পোড়ানোর কাজ চলছে। এতে বায়ু দূষণ রোধে প্রশাসনের কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এ ছাড়া লাল মাটি কেটে ট্রাক ও ট্রলির মাধ্যমে মাটি-বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা চলছে। এর ফলে নষ্ট হচ্ছে ছোট-বড় গ্রামীণ জনপদ। উপজেলার প্রায় সর্বত্রই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়ম বহির্ভূতভাবে স্থানীয় ইটভাটাগুলোতে মাটি সরবরাহ করতে কৃষি জমির টপ সয়েল, নদীর চর ও পারের মাটি এবং টিলা জমির লাল মাটি দেদার কাটা হচ্ছে। রায়েদ ইউনিয়নের বাগেরহাট, আমরাইদ ও শুকুর মার্কেট এলাকা, টোক ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান, বারিষাব ইউনিয়নের নয়ানগর, বারিষাব বাজারসংলগ্ন এলাকা, শেলদা, কুশদী, করিহাতা, সনমানিয়া, আড়াল ও সিংহশ্রীসহ একাধিক স্পটে মাটি কাটার কার্যক্রম চলছে।

রাতের আঁধারে বিভিন্ন পরিবহনযোগে ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে মাটি বিক্রির চিত্র দৃশ্যমান রয়েছে। এসব মাটি পরিবহনের ফলে ছোট-বড় গ্রামীণ সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফসলি জমির টপ সয়েল, নদীর চর ও পারের মাটি এবং টিলা আকৃতির লাল মাটি কেটে এসব মাটি দিয়ে ইট প্রস্তুত করা হচ্ছে। পরে সেই ইট ও মাটি চড়ামূল্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এতে একদিকে কৃষি জমির উর্বরতা বিনষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। ফলে কৃষক ও কৃষি খাত হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থা থেকে কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে পরিবেশ আইন না মেনে ইটভাটা পরিচালনার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন কৃষক সংগঠনের অনেকে। অন্যদিকে, ইটভাটার কারণে বায়ু দূষণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামীণ জনপদ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি ট্রাক ও ট্রলির মাধ্যমে অবৈধভাবে মাটি পরিবহনের কারণে সরকারি বরাদ্দে নির্মিত ছোট-বড় গ্রামীণ সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কাপাসিয়ার ইটভাটাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে জানিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিদর্শক আরিফিন বাদল বলেন, গত ১৮ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজওয়ানুল ইসলামের নেতৃত্বে কাপাসিয়ার দুটি অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ ছাড়পত্রের নবায়নের সময়সীমা শেষের দিকে থাকা কয়েকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত শেষে আরও কয়েকটির ছাড়পত্র বাতিল হতে পারে। অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান কার্যক্রম চলমান থাকবে।

স্থানীয় শিক্ষক ও কৃষক সংগঠক কামরুজ্জামান সবুর বলেন, ইটভাটার জন্য দেদার মাটি কাটার ফলে জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ায় কৃষি ফসলের উৎপাদনক্ষমতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে কৃষি সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি পরিবেশ আইন না মেনে ইটভাটা পরিচালনা করলে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদুল হক বলেন, ব্যাপক হারে অবৈধভাবে মাটি কাটার বিষয়টি নজরে এসেছে। এসব কার্যক্রম বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি অভিযানে জরিমানা আরোপ ও কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। প্রয়োজনে অবৈধ ইটভাটা ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

You cannot copy content of this page