জাল দলিল বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড সাব-রেজিস্ট্রার মনিষা রায়


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৪, ২০২৬, ৭:০৪ AM /
জাল দলিল বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড সাব-রেজিস্ট্রার মনিষা রায়

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সাব রেজিস্ট্রার মনিষা রায় ঘুষ-দুর্নীতি, দলিল বাণিজ্য, ভলিউম লোপাট, টেম্পারিং, শ্রেণী পরিবর্তন, AP, VP ও বনাঞ্চলের জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি করে দিয়ে নিজে হয়েছেন বিত্ত বৈভবের মালিক, গড়ে তুলেছেন নামে বেনামে অবৈধ সম্পদের পাহাড়। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে সরকারী রাজস্ব ফাঁকি ও পে অর্ডারে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ।

যখন যেখানে কর্মরত ছিলেন সেখানেই নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী পরিচয় দিয়ে নিজস্ব ক্ষমতার বলয় সৃষ্টি করে গড়ে তুলেন শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট। এছাড়া নিজেকে সাবেক মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নিকটাত্মীয় পরিচয় দিয়ে নিজেকে রাখতে সকল বিতর্কের উর্ধে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তবে ৫ই আগস্ট ২০২৪ সার্বিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা দিল্লি পালিয়ে গেলে মনিষা রায় একপক্ষকালের জন্য নিজেকে গুটিয়ে নেন। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভোল পাল্টে মনিষা রায় এখন আবারও স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।। 

অতি সম্প্রতি এক ভূক্তভোগীর অভিযোগে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার মনীষা রায়কে জাল দলিল প্রস্তুত ও দলিলের ভলিউম ঘষামাজার অভিযোগে আদালতে তোলা হয়।

গত রবিবার (২৮শে ডিসেম্বর ২০২৫) দুপুরে নীলফামারী আমলি আদালতে মনিষা রায়কে হাজির করা হলে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে সন্ধ্যায় সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পুনরায় জামিন আবেদন করা হলে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পাঁচশ’ টাকার বন্ডে মুচলেকা দিয়ে তাকে জামিন দেওয়া হয়। তবে এ জামিনের বিষয়টি জেনে হতবাক ও বিষ্মিত ভূক্তভোগী সুমন সরকার। তাঁর ধারণা গোপনসিঁড়ি ব্যাবহার করে এই জামিন মঞ্জুর করানো হয়েছে। সুমন সরকার এই জামিনের বিষয়টি আইন উপদেষ্টা,আইন সচিব ও আইজিআর কাজী আব্দুল হান্নান মহোদয়কে লিখিত অভিযোগে জানাবেন বলে সংবাদমাধ্যমকে অবহিত করেন। এছাড়াও তার জমি জালিয়াতি ও টেম্পারিং এর অভিযোগে তিনি নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ ও দেশবাসীকে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, দলিল প্রতি ৯ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা দক্ষিণা না পেলে তিনি কোনো জমি রেজিষ্ট্রেশন করেন না। এছাড়া গোপন চুক্তিতে জমির শ্রেণী পরিবর্তন এবং হায়ার ভ্যালু ও আন্ডার ভ্যালুর মারপ্যাঁচে ফেলে তাঁর কথিত সহকারী ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লুটে নেন লক্ষ লক্ষ টাকা। এছাড়া কোনো দলিল দাতা গ্রহীতার এনআইডি কার্ডের বানানে সামান্য ত্রুটি ও পর্চায় নূন্যতম সমস্যা থাকলে ” এসব জমি কস্মিনকালেও রেজিস্ট্রি সম্ভব নয়” বলে নাটক সৃষ্টি করে গোপন চুক্তিতে তাঁর কথিত সহকারীর মাধ্যমে হাতিয়ে নেন কড়কড়ে বান্ডিল। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগে মনীষা রায় নীলফামারীর “জলঢাকা” উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা সুমন সরকারের বাবা আক্কাস আলীর মৃত্যুর পর তার নামে থাকা ৪৮ শতাংশ জমি বণ্টননামা দলিল অনুযায়ী ওয়ারিশরা ভোগদখল করে আসছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালের ৮ই ডিসেম্বর চাপানী ইউনিয়নের বাসিন্দা গোলাম হাবিব ও রাজিব হোসেন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সহযোগিতায় জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ওই জমির মধ্যে সাড়ে সাত শতাংশ জমি মিজানুর রহমানের কাছে বিক্রি করেন।

এ ঘটনায় ২০২২ সালের ১০ই ডিসেম্বর সুমন সরকার বাদী হয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মনীষা রায়সহ ৭জনের বিরুদ্ধে নীলফামারী আমলি আদালতে মামলা দায়ের করেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, দলিল লেখক সেলিম ইসলাম, গোলাম হাবিব হাদী, রাজিব হোসেন, মিজানুর রহমান, ফজলুল হক ও আনোয়ার হোসেন।

পরবর্তীতে আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৫ই ফেব্রয়ারি ডিমলা থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে জমিতে অনধিকার প্রবেশ এবং প্রতারণার উদ্দেশে মূল্যবান দলিল জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের আশায় প্রকৃত মালিকানা যাচাই না করেই দলিল রেজিস্ট্রি সম্পাদন করেন।

মামলার বাদী সুমন সরকার বলেন, আমার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি আমরা আইনগতভাবেই ভোগদখল করে আসছিলাম। অথচ কাগজপত্র যাচাই না করেই আমাদের জমি অন্যের কাছে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।

এ ছাড়া, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালায়। অভিযানে একটি বায়নানামা দলিলে প্রথমে ৩৩ লাখ টাকা উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীতে রেজিস্ট্রির সময় ১৬ লাখ টাকা মূল্য দেখানোর অভিযোগ ওঠে। এতে সরকার প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে আসে।

কে এই মনিষা রায়:

রংপুরে মধ্যবিত্ত সনাতনী পরিবারে ১লা জুলাই ১৯৮৮ সালে মনিষা রায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটোবেলা থেকেই মেধাবী মনিষা বরাবরই মেধার স্বাক্ষর রেখে বিএসসি( কৃষি) ও এমএস ইন উদ্যান তত্ত্বে কৃতকার্য হন।
২রা জুন ২০১৩ সালে তিনি সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে মনোনীত হন। তাঁর প্রথম পদায়ন নিজ জেলা রংপুরের তারাগঞ্জে, এরপর পর্যায়ক্রমে, রংপুরের কাউনিয়া, টাঙ্গাইলের ভূয়াপুর, নীলফামারীর জলঢাকা, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২রা মার্চ ২৯২৫ নিবন্ধন অধিদপ্তরের এক বদলি আদেশে তাঁকে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগাছায় বদলি করা হয়৷ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিতা। স্বামী নীলফামারী জেলার জলঢাকায় মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত।

প্রতিবেশীর বক্তব্য:

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ” স” অদ্যাক্ষরের তাঁর একজন প্রতিবেশী বলেন। মনিষা খুব ভালো ছাত্রী ছিলেন। মাস্টার্স্ শেষ করার পর আমরা ভেবেছিলাম সে হয়তো কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পেশা বেছে নিবেন।
আর জাল দলিলের মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুপুরে আদালতে জামিন না মঞ্জুর আর সন্ধ্যায় জামিন পাওয়াতে আমরাও বিষ্মিত- হতবাক। তিনি আরও বলেন এখন বুঝতে পারছি শিক্ষকতা না করে তিনি সাব রেজিস্ট্রার হয়েছিলেন শুধুমাত্র নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে।।

 

 

বি: দ্র: দ্বৈত নাগরিকত্ব ও তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের ফিরিস্তিসহ আগামীকাল বিস্তারিত পড়তে
আমাদের সাথেই থাকুন। চোখ রাখুন জাতীয় দৈনিক এই আমার দেশ ও আজকের পেপার পত্রিকার প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে।।

You cannot copy content of this page