
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, ঢাকা:
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের অবৈধ নিয়োগের হাজারো পেতাত্মার মধ্যে জাল জালিয়াতি, ঘুষ দুর্নীতিতে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ হিসেবে নিজেদের জাত চেনাতে সক্ষম হয়েছে রাজধানীর “”ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের উমেদার রানা চৌধুরী, আশিক উদ্দিন ও সাদ্দাম হোসেন””। এদের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের পাহাড়সম অভিযোগ রয়েছে কর্মকালের শুরু থেকেই।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, ঢাকা জেলার ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রি অফিসে একজন বৈধ পিয়ন থাকা সত্ত্বেও মাথাপিছু “” দৈনিক ৬০ টাকা “” হাজিরার ধান্দাবাজ
অকর্মা ৯ জন উমেদারের আনাগোনা সকাল সন্ধ্যা বিদ্যমান।
দলিলের পিছনে ছুটে ছুটে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ায় এদের একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে করেন সচেতন মহল । আর এই সিন্ডিকেটকে দীর্ঘদিন যাবৎ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অবৈধ পন্থায় নিয়োগ পাওয়া ফেনী বাঞ্ছারামপুর নিবাসী ধুরন্ধর উমেদার রানা।
ঘুষ-দুর্নীতি, জমির শ্রেণী পরিবর্তন, ভলিউম লোপাট, টেম্পারিং, এনআইডি পরিবর্তন করে ভূয়া দলিল সম্পাদন, AP ( এ্যনিমি প্রোপার্টি), VP ( ভেস্ট প্রোপার্টি), বনভূমী এবং সড়ক ও জনপথের জমি ব্যক্তি মালিকানায় এবং ডেভলোপার কোম্পানীকে গোপন চুক্তিতে বেআইনিভাবে দলিল রেজিস্ট্রি করিয়ে দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে এবং এখনো হাতাচ্ছে কোটিকোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উমেদার রানা, আশিক, সাদ্দাম দলিলের মাথায় বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন না দিলে সাব রেজিস্ট্রার সেসব দলিলে স্বাক্ষর করেন না। ওই বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন দেখতে পেলেই সাব রেজিস্ট্রার বুঝতে পারেন তাঁর চাহিদা মোতাবেক সকল টাকাই উমেদার রানা ও আশিক গংয়ের পকেটে, আর এসব সাংকেতিক চিহ্ন সম্বলিত দলিল সাব রেজিস্ট্রার স্বাক্ষর করেন খোশমেজাজে। ঘুষ দুর্নীতি ও দলিল জাল জালিয়াতির মাস্টারমাইন্ড হকার রানা, আশিক, সাদ্দাম গং কথিত উমেদারের চাকরির শুরু থেকেই এদের নামে রয়েছে পাহাড়সম দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্যের অসংখ্য অভিযোগ।

৯ই মে ২০১৮ তারিখে মাত্রাতিরিক্ত ঘুষ বাণিজ্য, দলিল দাতা-গ্রহীতাদের সাথে প্রকাশ্যে জঘন্য দুর্ব্যবহার ও পে-অর্ডার আত্মসাৎ করার অপরাধে উমেদার রানা চৌধুরীকে নিবন্ধন অধিদপ্তরের নির্দেশে প্রথমে আশুলিয়া বদলি করা হয়। কিন্তু, তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার ১৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে কয়েক মাস পর রানাকে পূনরায় ধানমন্ডি সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে বেআইনীভাবে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন ।
তবে “” চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী “” তাই ধানমন্ডিতে বহাল হওয়ার সাথেসাথেই পূর্বের হাজারো অপকর্মের রেশ কাটতে না কাটতে রানা চৌধুরী, তার সেকেন্ড ইন কমান্ড আশিক উদ্দিন ও মোঃ সাদ্দাম হোসেনকে নিয়ে অবৈধ টাকার নেশায় জড়িয়ে পড়ে আরেক জঘন্যতম অপকর্মে।
গত ৯ই নভেম্বর ২০২০ তারিখে ৪ টি দলিল রেজিস্ট্রিতে ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ, দুর্নীতির ইতিহাসে তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করে।
ওই ৪টি দলিল নং যথাক্রমে ২৮১৯, ২৮২০, ২৮২১ ও ২৮২২, দাতার নাম শহীদ সারোয়ার নিজাম গং।
রানা চক্রের ওই “ভয়াবহ পুকুর চুরির অনিয়ম” আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য তৎকালীন সাব রেজিস্ট্রার, গুলশান, ঢাকাকে দায়িত্ব দেয়া হয়।
তদন্তে উঠে আসে উক্ত দলিল বাবদ কোন ভ্যাট ও এফ এফ জমা দেওয়া হয় নাই। ফলে সরকারি কোষাগার প্রায় ১৪ লক্ষ টাকার রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৪ই ডিসেম্বর ২০২০ তারিখের ৬৮৪ সংখ্যক স্মারকে উমেদার রানা চৌধুরীকে কালামপুর ( ধামরাই) সাব রেজিস্ট্রার অফিসে, আশিককে শ্যামপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে ও মোঃ সাদ্দাম হোসেনকে ডেমরা সাব রেজিস্ট্রার অফিসে শাস্তমূলক বদলি করা হয়।
তবে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের পালিত নেতারা তদবির করে পুনরায় ২৫ লক্ষ টাকা গোপনে গ্রহণ করে উমেদার মো: রানা চৌধুরী, মো: আশিক ও মো: সাদ্দাম হোসেন কে আবারও ধানমন্ডি সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে স্বসম্মানে ফিরিয়ে নিয়ে এসে নিবন্ধন অধিদপ্তর ও আইন মন্ত্রনালয়ের “অফিস আদেশের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দেয়”। ধানমন্ডি সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে বদলি হয়ে আসার পর থেকে অদ্যবদি রানা, আশিক ও সাদ্দাম পূর্বের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে বেপরোয়া ভূমিকায় অবতীর্ণ।

এছাড়া গত ৩০শে এপ্রিল ২০২৪ তারিখে রানা চক্র দলিল নং ১৫০৬ এর ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ২ লাখ ৫৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন । এর আগেও পে- অর্ডারের টাকা আত্মসাৎ করার দায়ে রানাসহ এই উমেদার সিন্ডিকেটকে কয়েক দফায় বিভিন্নস্থানে বদলি করা হয়।
বেপরোয়ানীতি ও অনিয়মের চরম শিখরে পৌঁছে রানা চক্র প্রতি দলিলের জন্য টাকা প্রদান না করলে দলিল লেখকদের সাথে ঝগড়াঝাঁটি ও শাসানোর ঘটনায় লিপ্ত হয় ।
ধানমন্ডি সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের অবৈধ পন্থায় নিয়োগ পাওয়া এই উমেদার সিন্ডিকেট পেশীশক্তি ও অবৈধ কালোটাকার গরমে দলিল দাতা-গ্রহীতা, অফিসের অন্যান্য স্টাফ, সাব- রেজিস্টার, জেলা রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকদেরকেও জিম্মি করে রেখেছে।
প্রায় সময়ই সাবেক লিকার চা ফেরিওয়ালা রানাকে উচ্চস্বরে বলতে শোনা যায়- “”আমরা টাকা হলে সব করতে পারি””,। আরও বলেন আমরা নগদ টাকার বান্ডিল দিয়ে ধানমন্ডি অফিসে বদলি হয়ে এসেছি। রানা দম্ভভরে সবসময় বলে থাকেন “” ডিআর, আইজিআর, সচিব, জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব রেজিস্ট্রার আমাদের কিছুই করতে পারবে না “”,কারণ সবাই আমাদের কাছ থেকে মাসেমাসে টাকা খায়””। এমনকি “” পুলিশ প্রশাসনও আমাদের পকেটের লোক””। তাই কোনো অফিগসারকে সমীহ করা বা তেল মারার সময় আমাদের নেই!!

হাতিরঝিল মহানগর হাউজিংয়ে ৩য় তলায় কেনা ১৮শ বর্গফুট আয়তনের লাক্সারি ফ্ল্যাট। একই বিল্ডিংয়ে তার আরো একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
রামপুরা বনশ্রীতে নিজ মালিকানায় ৪তলা বিলাসবহুল বাড়ি।
ঢাকা আফতাবনগরের সেক্টর-১, রোড নং- ৫ এ একটি ফ্ল্যাট।
ঢাকার বাসাবোতে ৫ কাঠা মহামূল্যবান জমি।
তার গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার দাগনভুঁইয়ায় কিনেছেন প্রায় ৩০ একর (৯০বিঘা প্রায়) জমি ও ৫টি বাণিজ্যিক দোকান।
এছাড়াও ৬০ টাকা হাজিরার কোটিপতি উমেদার রানার আছে ৩টি হাইয়েছ মাইক্রো, যেগুলো সে রেন্ট এ কার’এ ভাড়া দিয়ে রেখেছে।
রানা নিজে বিলাসবহুল প্রাইভেট কারে চলাফেরা করে থাকেন। এমনকি বসত ভিটায় ৫ তলা ফাউন্ডেশনের লক্ষ্যমাত্রা রেখে ৩ তলা পর্যন্ত বিল্ডিং সম্পূর্ণ করা, যার নির্মাণ খরচ ইতোমধ্যে ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়াও তার নিজ গ্রামে বেনামে বেশকিছু সম্পত্তি খরিদ করে রেখেছে। তাছাড়া নামে বেনামে তার রয়েছে একাধিক গোপন ব্যাংক একাউন্ট। সাবেক হকার রানা চোধুরী এসব সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন ধানমণ্ডি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে যোগদানের মাত্র ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে।
এই রানা ৭/৮বৎসর পূর্বে তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সামনে ফুটপাতে চায়ের দোকানে পেটেভাতে কাজ করতো।
উত্তরার দিয়াবাড়িতে ১০ কাঠার প্লট।
রামপুরা-বনশ্রীতে রয়েছে সম্রাট ডেভেলপার লিমিটেডের কাছ থেকে কেনা একটি বিলাসবহুল ফ্লাট। নারায়ণগঞ্জে ৮ কাঠার একটি প্লট।
তেজগাঁও কুনিপাড়ায় লিজ নেওয়া ১০ কাঠার একটি প্লট।
দুর্নীতিবাজ উমেদার আশিক ও নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। দেশে বিদেশে রয়েছে তার একাধিক যৌথ মূলধনী ব্যবসা-বাণিজ্য। আশিকের নামে রয়েছে ” মানি লন্ডারিং” এর অভিযোগ।
“”বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন”” দমন করতে আশিক সরাসরি যুবলীগ-ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সাথে রাতের আঁধারে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ব্যাপক মহড়া দিয়েছিলো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া ওই আন্দোলন দমন করার মিশনে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নির্দেশে দু দফায় লীগ ক্যাডারদের জন্য মোটা অংকের টাকা লগ্নী করেন আশিক।।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কথিত উমেদার রানা, আশিক, সাদ্দাম গংয়ের বিরুদ্ধে একাধিকবার “”ঘুষ দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জন”” এর বিষয়ে তদন্ত আসলেও অদ্যবদি দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের নজির নেই। আর এসব কারণে, তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অফিসে কর্মরত স্টাফ ও দলিল লেখকরা বলাবলি করে যে, অবৈধ অর্থের জোরে বারবারই পার পেয়ে যায় রানা চক্র। বিশেষ সূত্রে জানা যায়, যে কর্মকর্তাদের তদন্ত ভার দেওয়া হয় তাদেরকেই ম্যানেজ করে ফেলে রানা চক্র।






















You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :