

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম:
দেশের সর্ববৃহৎ জেলা রেজিস্ট্রার অফিস চট্টগ্রাম। এখানে D.R ( ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার) হিসেবে ২২শে জানুয়ারি ২০২৫ যোগদান করেন নারায়ণগঞ্জ খ্যাত D.R জামিলুর রহমান( জামিল)। চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার এর আওতায় রয়েছে মোট ২২ টি সাব রেজিস্ট্রার অফিস। এখানে প্রতি কর্মদিবসে জমি রেজিষ্ট্রেশন হয় ৪হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার। কখনো কখনো এ সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এখান থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আরহণের কথা থাকলেও এটি রয়েছে ঢাকার অনেক পিছনে। কখনো কখনো রাজশাহী, খুলনা বা বরিশালের পিছনে পড়ে যেতে দেখা যায়। দেশের সব থেকে বেশি সাব রেজিস্ট্রার, রেকর্ড কিপার, নকলনবিশ, পাইক-পেয়াদা ও বিশাল বহরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দলিল লেখক চট্টগ্রাম রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের আওতায় থাকলেও তার সুফল সরকার পাচ্ছে কদাচিৎ।।

অনুসন্ধানে দেখা যায় এখানকার অধিকাংশ সাব রেজিস্ট্রার ও অফিস স্টাফবৃন্দ রয়েছেন নানাবিধ ধান্দাফিকির আর ঘুষ দুর্নীতি ও দলিল বাণিজ্যের লুটপাটের টাকায় কোটিপতি হওয়ার প্রকাশ্য মিশনে। এখানে ঘুষ দুর্নীতি ওপেন সিক্রেট। কারো ভীতরে কেনো সংকোচ বা জড়তা নেই। সবকিছু চলছে মহোৎসবে, খোশমেজাজে। এখানে A.P/ V.P ও বনবিভাগের জমি হামেশাই রেজিষ্ট্রি হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানায় এবং ডেভলোপার কোম্পানীর সাইনবোর্ডের অন্তরালে। আর কথায় কথায় জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে হায়ার ভ্যালু আর আন্ডার ভ্যালুর কারিশমায় সাব রেজিস্ট্রাররা লাখ লাখ টাকা দলিল প্রতি হাতিয়ে নিয়ে সরকারি “” রাজস্বখাত কে রাখা হচ্ছে হাড্ডিসার কঙ্কাল “” করে।।
এছাড়া নকল তোলা, দানপত্র, বণ্টননামা ও চুক্তিপত্রের মতো দলিলেও ইচ্ছে মতো কামিয়ে নিয়ে সরকারি কোষাগারে নামকাওয়াস্তে কিছু ফেলে দেওয়া হয়।

জেলা রেজিস্ট্রার নাস্তা খরচের নামে দলিল প্রতি ৫০০ ও সাব রেজিস্ট্রার অফিসগুলো থেকে মাসিক ২ লাখ টাকা করে নিয়ে নিশ্চুপ রয়েছেন বলে অভিযোগ ভূক্তভোগীদের।একজন ভূক্তভোগী বলেন, সাব রেজিস্ট্রারদেরকে দলিল প্রতি লাখে ১ হাজার, নকলে ৫০০ এবং ভূতুড়ে সেরেস্তা খরচ, দলিল লেখক সমিতির টাকা না দিলে দলিল আটকে রেখে প্রকাশ্যে দরকষাকষি করা হয়। সরকারি খরচের বাইরে কেউ যদি ২/৪ হাজারে কাজ সারবেন মনে করলে তাকে বিনি দোষে ঘুরতে হবে মাসের পর মাস। তাদের চাহিদা মোতাবেক টাকা না দিলে নিষ্কণ্টক জমির দলিলেও অসংখ্য ভুল ও সমস্যা উত্থাপন করা হবে। আর চাহিদার টাকা দিয়ে দিলেই সব সমস্যা নিমিষেই সমাধান।
D.R জামিলুর রহমানের অধিনস্ত ২২ সাব রেজিস্ট্রার অফিসে কথায় শ্রেণী পরিবর্তন, মাঝেমাঝে ভলিউম লোপাট, টেম্পারিং, নকল NID দিয়ে জাল দলিল প্রস্তুত, নামজারি ছাড়াই জমি রেজিষ্ট্রি, দাতা গ্রহীতারা সকলে উপস্থিত না থাকলেও হচ্ছে দলিল সম্পাদন। তাছাড়া সমস্যা জর্জরিত দলিল সাব রেজিস্ট্রাররা আইন মোতাবেক ফিরিয়ে দিলেও সেসব জমি রেজিস্ট্রি করতেও D.R অফিস থেকে ফোন করে দুর্গম এলাকায় ট্রান্সফারের ভয় দেখিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সমস্যা বহুল ওইসব দলিল থেকে বিশেষ সহকারীর মাধ্যমে আবার কখনো প্রধান সহকারীর মাধ্যমে কড়কড়ে বান্ডিল হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ভূক্তভোগীদের।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, একেকটি বদলিতে ৫/৬ লাখ টাকা আর প্রতিটি নিয়োগে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নেন জেলা রেজিস্ট্রার জামিলুর রহমান জামিল। চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় প্রায় ৩২০ জন কাজী ( মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার) রয়েছে, এদের নিয়ে জেলা রেজিষ্ট্রেশন অফিসের রয়েছে বিশাল বানিজ্য। নগর ও জেলার ডজনেরও বেশি নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বছরে দুইবার অডিটের নামে পাঁচ হাজার করে দিতে হয় জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে, ইনডেন্ট অর্থ্যাৎ কাজীদের প্রয়োজনীয় সরকারি ফরম ও বিবিধ কাগজ পত্র পাওয়ার আবেদন। ব্যাংক চালানের মাধ্যমে সরকারি ফি জমা দেওয়ার পরও নগদ বীনা রশিদে গুনতে হয় ৫ -৬ হাজার টাকা। হিসাব মতে শুধু কাজীদের কাছ থেকে সিজন প্রতি আসে প্রায় কোটি টাকা। আর দলিল লেখকদের লাইসেন্স ও নবায়নেও সিজনে ধান্দা কোটি টাকা। আর প্রতি কর্মদিবসে দলিল প্রতি ৫০০ টাকা হিসেবে D.R’ এর ঝুলিতে জমা পড়ছে ২০/২৫ লাখ টাকা। যা তিনি আদায় করে থাকেন সহকারীর মাধ্যমে।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জামিলুর রহমান সাব রেজিস্ট্রার থেকে পদোন্নতি পেয়ে সাবেক আইনমন্ত্রীর পিএস বাবু ও এপিএস জীবন কে উপঢৌকনে সাজিয়ে জেলা রেজিস্ট্রার হন ২০১৯ সালের ৩রা জুন। D.R হিসেবে তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিলো চুয়াডাঙ্গা। এরপর সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে তুষ্ট করে নেত্রকোনা ঘুরে থিতু হন উড়ন্ত টাকার ডিপো হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জে জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে। এখান থেকেই BRSA নেতা রমজান খানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ চৌকস তদবিরকারী দল আইন উপদেষ্টা মহোদয় ও আইজিআর মহোদয়ের কাছে দেনদরবার করে চাকরিজীবনের শেষ সময়ে ভোল পাল্টে ২২শে জানুয়ারি ২০২৫ পুশ করে দেন জেলা রেজিস্ট্রার চট্টগ্রাম পদে। এখান থেকে চলতি বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর তাঁর পিআরএলে যাওয়ার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রামে অবসরে যাওয়ার আগে তিনি ডিউটি করবেন মোট ৬২৯ দিন। এর মধ্যে শুক্র শনি ও সরকারি ছুটি ১০২ দিন বাদ দিলে তিনি মোট উপস্থিত থাকবেন ৫২৭ দিন। এরমধ্যে আর বাকি আছে ১৬২ কর্মদিবস।
তো সব হিসেব বাদ দিলেও শুধু দলিল প্রতি ৫০০ টাকা প্রতিদিন ও ১৬২ কর্মদিবসে কতো হাতাবেন সে হিসেব টা পাঠক আপনাদের কাছে ছেড়ে দিলাম……..






















You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :