ঢাকা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ভলিউম চুরি, পাতা ছেঁড়া,টেম্পারিং ও জাল দলিল বাণিজ্যের কুশীলবরা থেকে যায় পর্দার অন্তরালে


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২০, ২০২৬, ৬:৫৮ AM /
ঢাকা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ভলিউম চুরি, পাতা ছেঁড়া,টেম্পারিং ও জাল দলিল বাণিজ্যের কুশীলবরা থেকে যায় পর্দার অন্তরালে
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক সজীব আকবর:

পতিত শেখ হাসিনা সরকারের টানা ১৭ বছরসহ এখনো নিরাপত্তা ঝুঁকিতে তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স। যেকোনো সময় ঘটতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিকল্পিত ঘটনা। সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম, সাবেকুন নাহারের সময় থেকে বর্তমান সময়েও সেই চিহ্নিত সিন্ডিকেট এখনো বহাল, এখনো সক্রিয়।
দফায় দফায় ভলিউম চুরি, রহস্যজনক আগুন,শ্রেণী পরিবর্তন, রাজস্ব লোপাট, জাল জালিয়াতিতে নকল দলিল প্রস্তুত, গ্রাহকের এনআইডি ও নাম সুকৌশলে পরিবর্তন, মূল মালিকপক্ষকে পথে বসিয়ে পর্দার অন্তরালে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন, খাসখতিয়ান ও শত্রুসম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় ও ডেভলপার কোম্পানিকে গছিয়ে দিয়ে এই সিন্ডিকেটের সকলে কোটিকোটি টাকা ও বাড়ি গাড়ি এবং নামে-বেনামে একাধিক ব্যবসা বাণিজ্য রমরমা চালালেও এদের কাউকে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনা হয়নি।

মাত্র ৬০ টাকা দৈনিক হাজিরা ও নামমাত্র বেতনের কর্মচারীদের যেখানে “নুন আনতে পান্তা ফুরানোর কথা”, সেখানে তারা কোটিকোটি টাকার মালিক। দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম, গোয়েন্দা সংস্থা বা আইজিআর অফিস আজ পর্যন্ত জানতে চায়নি বেতনকাঠামোর সাথে আকাশপাতাল পার্থক্যের এই বিশাল অবৈধ সম্পদের পাহাড় তারা কি করে করায়ত্ব করলেন ?? পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে নিবন্ধন অধিদপ্তরের আওতাধীন সকল জেলা রেজিস্ট্রার, সাব রেজিস্ট্রার ও অফিস স্টাফ, মুজিবনগর সরকারের কথিত কর্মচারী তথা ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সাব রেজিস্ট্রার ও ভূয়া জেলা রেজিস্ট্রারসহ ৯৫% অকুণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। ফলে এই সমাজ পেয়েছে বরিশাল সদর খ্যাত দেশসেরা লুটেরা সাব রেজিস্ট্রার অসীম কল্লোল, গাজীপুর শ্রীপুর কাপাসিয়া খ্যাত ওসমান গণি মন্ডল, রংপুর সদর খ্যাত রামজীবন কুন্ডু, রাজধানীর উত্তরা খ্যাত নীলফামারী জলঢাকার লুৎফর রহমান মোল্লা, বাগেরহাট মোংলার স্বপন কুমার দে, ধামরাই কালামপুর খ্যাত পারুল সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড আমিনের সহকারী থেকে রাতারাতি সাব রেজিস্ট্রার বনে যাওয়া ভোলা লালমোহনের মঞ্জুরুল ইসলাম, পত্নিতলা নওগাঁ থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া মুক্তিয়ারা খাতুন, কিশোরগঞ্জ সদর ও ফরিদপুর সদর খ্যাত দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে বিদ্ধ ভূয়া সাব রেজিস্ট্রার দম্পতি মিনতি দাস ও স্বামী পরিতোষ দাস, পটুয়াখালী সদরের দেড় বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা মো: ফারুক, পটুয়াখালী কলাপাড়া খেপুপাড়ার কাজী নজরুল ইসলাম, নোয়াখালী খ্যাত আবু তাহের মো: মোস্তফা, দিনাজপুর নিবাসী গাজীপুরের টঙ্গী খ্যাত আবু হেনা মোস্তফা কামাল, নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জ খ্যাত খোন্দকার গোলাম কবির, জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম, ধানমন্ডি খ্যাত সাব রেজিস্ট্রার আবুল হোসেন, নোয়াখালীর আবু তাহের প্রমূখ।


পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে— “” নগদ যা পাও, হাত পেতে নাও, বাকির খাতা শূন্য “”। ফলে খোদ রাজধানীর তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের দুর্দান্ত দাপুটে উমেদার, মোহরার, এক্সটা মোহরার, অফিস সহায়ক ও সাব রেজিস্ট্রার সহকারীরা এক একজন আওলাদ, মঞ্জু, মানিক, হারিছ, রাসেল, ইমরান, সবুজ, সোবহান বা মেহেদীদের মতো চোখধাঁধানো শানসৈকতের বদৌলতে পরিণত হচ্ছে সামাজিক কেউকেটাতে।

২০২৫ এর জুন মাসে তেজগাঁও রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সের বালাম বই থেকে দলিলের পাতা চুরির ঘটনায় লোকদেখানো তোলপাড় শুরু হলেও সে তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। আসমাসহ নেপথ্যের কুশীলবদের কাউকেই কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের তদন্তে ঘটনার সত্যতা প্রমানিত হলেও দৃশ্যমান অভিযুক্ত আসমাসহ নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের রক্ষায় বারংবার ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। পুলিশে না দিয়ে অভিযুক্তকে রক্ষায় শুধু মাত্র কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ায় ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

আসমা কেনো হঠাৎ বালাম বই থেকে দলিলের পাতা চুরি করে তার ব্যাগের ভীতরে লুকিয়ে রাখলো? নেপথ্য কোনো স্টাফ, সাব রেজিস্ট্রার, দলিল লেখক বা আওলাদের মতো কোনো কেউকেটার যোগসূত্র আছে কি-না তা একবারও ক্ষতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি কর্তৃপক্ষ !! বরং সুন্দরী ললনা আসমাকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত করে কে সবার আগে আসমার সাথে অনৈতিক মধুচন্দ্রিমা যাপন করবেন– তারই অসুস্থ ধারার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা।

অভিযোগ রয়েছে, আসমার রূপের কাছে ধরাশায়ী ছিলেন, ‘দ’ আদ্যক্ষরের একজনসহ ঢাকার একাধিক সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব রেজিস্ট্রার। ফ্যাসিস্ট সরকারের অনেক প্রভাবশালী নেতার সাথেও ছিলো হালকা গড়নের আসমার সুগভীর সখ্যতা।

শুধু আসমার একটি ঘটনাই নয়, ভলিয়ম চুরি, বালাম বইয়ের পাতা ছেঁড়া, টেম্পারিংসহ, নথি বিভিন্ন কোম্পানীর কাছে সাপ্লাইয়ের জন্য এ কমপ্লেক্সে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী চক্র। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়া উমেদার-পিয়ন ও নকল নবিশরা এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। আর এদের রক্ষাবকচ হিসেবে নিজেকে নেতৃত্বের আসনে বসাতে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের নকলনবিশ আকিবের ভাই আওলাদ হোসেন হাজারো অভিযোগে অভিযুক্ত সিন্ডিকেট প্রধান থেকে রাতারাতি মনগড়া ও বিতর্কিত নকলনবিশ সমিতির কথিত নেতা বনে যান আওয়ামীপন্থী কতিপয় অর্থলোভী তৃতীয় শ্রেণীর নেতার বদৌলতে। বর্তমানে বিতর্ক এড়াতে আওলাদ হোসেন তার সহোদর আকিবকে পর্দার অন্তরালে রেখেছে। কিছুদিন আগে কূটচাল চেলে আরেক কোটিপতি উমেদার সোবহানকে কেরানীগঞ্জ জেলখানায় পাঠায় আওলাদগং। এছাড়া এই অফিসে তার অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করা এবং তার ভলিয়ম লোপাট, টেম্পারিং ও জাল দলিল প্রস্তুত বাণিজ্যে সংযুক্ত না হওয়ায় কয়কজনকে অফিস ছাড়া করে। অফিস থেকে বিতাড়িতরা কোথাও বিচার দিতেও ভয় পাচ্ছে। কারণ ওইসব অফিস বিতারিতদের উচিৎ শিক্ষা দিতে আওলাদ তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী তাদের পিছনে লেলিয়ে দিয়ে মোবাইলে হুমকি ধামকি অব্যহত রেখেছে। আর জামায়াত বিএনপি ঘুরে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের জামানায় রাতারাতি আওয়ামী যুবলীগ নেতা বনে যাওয়া আওলাদ হোসেন এখন বিএনপি তথা যুবদল নেতা হওয়ার স্বপ্ন বিভোর। সকাল সন্ধ্যা তাই মহানগর বিএনপির নেতার কদমবুচি করে নানাবিধ উপঢৌকন উপস্থাপন করে নিজেকে বিএনপি নেতা প্রমাণ করা এবং রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে বিএনপির বলয় সৃষ্টি করে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিস সহ গোটা কমপ্লেক্স তার কব্জায় নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর এখন আপন ভাই আকিব নয়, এখন তার সকল অকামকূকামের একমাত্র ছায়াসঙ্গী নকলনবিশ এনামূল।

কমপ্লেক্সের নিরাপত্তার প্রশ্নে সর্বশেষ বলা যায়, মাদক, ডাকাতি, গুন্ডামীসহ হাফডজন মামলার বিচারাধীন আসামী আওলাদ ও তার মতো অর্থপিশাচ সিন্ডিকেট যতোদিন এখানে সক্রিয় থাকবে ততক্ষণই তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের একেরপর এক অঘটন ঘটতেই থাকবে। আর দফায় দফায় ধরা পড়লে পর্দায় আবির্ভূত হবে আসমা, জরিনা, সখিনাদের মতো ছিঁচকে চোর, কিন্তু পর্দার অন্তরালেই থেকে যাবে কোটিপতি কুশীলবরা। তাই অচিরেই ব্যহত হতে পারে দেশসেরা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সার্বিক নিরাপত্তা।

You cannot copy content of this page