চট্টগ্রাম রাজস্ব কর্তার হাতে আলাদীনের চেরাগ,,শতকোটি টাকার মালিক আলতাফ হোসেন


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৬, ২০২৬, ৯:৫৯ AM /
চট্টগ্রাম রাজস্ব কর্তার হাতে আলাদীনের চেরাগ,,শতকোটি টাকার মালিক আলতাফ হোসেন

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের হাতে যেনো আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ। মাত্র কয়েক বছরেই আকাশচুম্বী বিত্তবৈভব গড়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পরিচিতজনদের। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ এতো অল্পসময়ে অর্জন কীভাবে সম্ভব, সেসব নিয়ে কলিগ ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন থাকলেও, তাঁকে কখনো বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।

চট্টগ্রাম কাস্টমস অফিস অসংখ্যবার ঘুষ দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডদের কারণে হয়েছে সংবাদ শিরোনাম। এখানে পিয়ন চাপরাশি থেকে ঝাড়ুদার নাইটগার্ড সবার শরীরেই বিত্তবৈভবের ছোঁয়া। বিলাসি জীবনযাপন যেনো বাধ্যতামূলক!! এবার সেই চট্টগ্রাম কাস্টমস এর রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন এর বদৌলতে আবারো হাইলাইটস্ এই বনেদি অফিস।

মাত্র এক যুগে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন।কাস্টমসের চাকরি মানে নর্মালেই কোটিপতি। সেটা আবারো প্রমাণ করেছেন কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত এই কর্মকর্তা। মাত্র এক যুগের কর্মযজ্ঞে হয়েছেন শতকোটি টাকার মালিক।

আলতাফ হোসেন তাঁর নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন রাজপ্রাসাদ। ঢাকাতে গড়েছেন একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট। চড়েন দামি গাড়িতে। স্ত্রী, সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনদের নামে গড়েছেন একাধিক সম্পত্তি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কাস্টমস ও ভ্যাটের ১৪ ব্যাচের এই কর্মকর্তার এমনই তথ্য!

জানা যায়, ২০১৪ সালের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন আলতাফ হোসেন। এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।অনুসন্ধানে জানা গেছে,  আলতাফ হোসেন সবচেয়ে বেশি ঘুষ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলামের সময়ে। শুল্ক গোয়েন্দার তখনকার মহাপরিচালকের ডান হাত ছিলেন এই আলতাফ। এমনকি ক্যাডার অফিসারদেরও ছাড় দেননি তিনি। একদিকে ঘুষের মাধ্যমে অর্জন করতেন কোটি কোটি টাকা, অন্যদিকে ক্ষমতার দাপটে মাটিতে পা পড়তো না এই রাজস্ব কর্মকর্তার।

শুল্ক গোয়েন্দায় আলতাফ থাকাকালীন শাহজালাল বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটে প্রায় ১ বছরের বেশি সময় ধরে ছিলেন। সেখানে থেকে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন এই কর্মকর্তা। যা সবকিছু জানতো তখনকার শুল্ক গোয়েন্দা প্রধান।  নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক গোয়েন্দা দপ্তরে একটি পদে সর্বোচ্চ ৬ মাসের জন্য পদায়ন হয়ে থাকে। কিন্তু এই আলতাফের বিষয়ে কোন নিয়ম মানা হয়নি।

বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জের ফুলহাতা গ্রামের বাসিন্দা কাস্টমস এর বহুল আলোচিত এই আলতাফ হোসেন টাকার কুমির। পৈত্রিক সূত্রে মোড়লগঞ্জের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে তিনি মুন্সীগঞ্জের কোটায় চাকরি করছেন বলে তথ্য রয়েছে। এই ব্যাপারে আলতাফ হোসেনের মোবাইলে ফোন করে ও হোয়াটস অ্যাপে তথ্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও তিনি যোগাযোগ করেননি।

 

অতি সম্প্রতি এনবিআরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য আলতাফ হোসেন ও তার সিন্ডিকেট এনবিআর এর আন্দোলনে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলনে তার অংশগ্রহণের ভিডিও ফুটেজ ও তথ্য প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

১০ম গ্রেডের  (ক্ষেত্রবিশেষে ১১ বা তার নিচের গ্রেডও হতে পারে) একজন সামান্য কর্মকর্তা হিসেবে প্রাপ্য বেতনে তার ঢাকা শহরে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করাই যেখানে দূরহ ঠিক সেখানে আলতাফ হোসেন ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় গড়ে তুলেছেন একাধিক ফ্ল্যাট। তার সারা জীবনের চাকরিকালীন বেতন সর্বসাকুল্যে বলার মতো নয়। অথচ তিনি সম্পদ করেছেন শতকোটি টাকার। উল্লেখ্য যে, ১০ম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার সর্বসাকুল্যে বেতন ৩৮,৬৪০ (আটত্রিশ হাজার ছয়শত চল্লিশ) টাকা।

বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, আলতাফ হোসেনের অর্জিত সম্পদের তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ। আপাদমস্তক দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন, অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও দুর্নীতির বরপুত্র আলতাফ হোসেন বিভিন্নজনের নিকট বলেছেন, টাকা হলে দুদককে কেনা যায়। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও দুদকের কর্মকর্তাদের ব্যাপারেও বিরূপ মন্তব্য করেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা এই তথ্য দেন।

সূত্র মতে, এনবিআর এর একজন সাবেক ক্ষমতাধর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুপারিশে আলতাফ চাকরিতে যোগদান করেন বলে জানা গেছে। ঐ কর্মকর্তার দাপটে তিনি এনবিআর এ অদম্য ক্ষমতাধর হয়ে উঠেন। শুধু তাই নয়, ঐ কর্মকর্তার নাম ভাঙ্গিয়ে দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডও বনে যান।

চাকরি জীবনের শুরুতে সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা পদে কিশোরগঞ্জে তার পদায়ন করা হয়। এরপর খুলনা, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর ও সর্বশেষ চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে তার পদায়ন।

তিনি একজন আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি তার সহকর্মীদের নিকট বলে থাকেন, ঊধ্বতন কর্মকর্তারা যেখানে ঘুষ ছাড়া ফাইল ছাড়েন না এবং অপরদিকে নজরানা দিতে হয় সেক্ষেত্রে আমাদের দুর্নীতি করতে বাধা কোথায়  ?

গণমাধ্যমকে তিনি মোটেও পরোয়া করেন না। আমাদের অনুসন্ধানী টিম যাত্রাবাড়ির দনিয়ার ৩০০/১, পূর্ব রসুলপুর ঠিকানায় তার একটি আলিশান ফ্ল্যাটের সন্ধান পায়। অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় রসুলপুরের মাস্টার বাড়ীতে নির্মানাধীন ১১ তলা ভবনের ৯ম তলায় তার আরও একটি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়াও স্ত্রী ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের নামে-বেনামে বিভিন্ন স্থানে সম্পদ ও ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে বলে জানা গেছে।

একজন সামান্য রাজস্ব কর্মকর্তার সম্পদ দেখে এই অনুসন্ধানী টিম হতবাক। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে চাকরিপ্রাপ্ত আলতাফ হোসেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর। তার রয়েছে আলাদা সিন্ডিকেট। পুরো সিন্ডিকেটের ঘুষ দুর্নীতির মূল কারিগর আলতাফ হোসেন।

( চলবে)

এ বিষয়ে আগামীকাল বিস্তারিত পড়ুন আমাদের প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে

You cannot copy content of this page