সাভার উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদ গং এর লাগামহীন ঘুষ দুর্নীতি


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৬, ২০২৬, ৭:৪৯ AM /
সাভার উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদ গং এর লাগামহীন ঘুষ দুর্নীতি

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, ঢাকা:

রাজস্ব সার্কেল সাভার উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তির নামে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদ নিজেকে আওয়ামী ঘরানার লোক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে নিজস্ব ক্ষমতার বলয় সৃষ্টি করে নানান অনিয়ম, ঘুষ- দুর্নীতি, একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার ও নিজস্ব সিন্ডিকেট গড়ে তোলার খবর স্থানীয়দের মুখেমুখে। এই সিন্ডিকেটে যুক্ত কতিপয় চিহ্নিত দালাল ছাড়াও সাভার উপজেলা ভূমি অফিসে কর্তব্যরত মিস কেস সহকারী মিরাজ হোসেন ও সার্ভেয়ার মোঃ আব্দুল করিম প্রমূখ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদ ও সার্ভেয়ার মোঃ আব্দুল করিম সাভার উপজেলা ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই এসিল্যান্ড’র ভালো মানুষী ও সহজ সরলতার সুযোগ নিয়ে নিজস্ব সিন্ডিকেট লালনপালন, একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও সর্বোচ্চহারে ঘুষ আদায়ের নিরাপদ বাণিজ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন!!

টাকা ছাড়া এই দু’জনের কাছে থেকে সেবা না পাওয়া ভূক্তভোগীদের ভাষ্যমতে সাভার এসিল্যান্ডের সার্ভেয়ার ও কানুনগো যেন মহাক্ষুধার্ত অর্থপিশাচ! বিগত ৭/৮ বছরের মধ্যে সাভার এসিল্যান্ড অফিসে এরকম সিন্ডিকেটধারী, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখেঁকো অফিসার সাভারবাসী আগে কখনো দেখেনি! তারা নগদ টাকা পেলে সবধরনের কাজ করে থাকেন। টাকা না পেলে নানান অযুহাত তুলে নির্ভেজাল কাজও ভূমি সহকারী কমিশনার বরাবর না মঞ্জুরের সুপারিশ করে পাঠায়। ভূমি অফিসের দুজন সিনিয়র ব্যক্তি’র (কানুনগো-সার্ভেয়ার) মাধ্যমে যখন কোনো নামজারি নথি এসিল্যান্ড বরাবর না মঞ্জুরের সুপারিশ করা হয়, তখন ভূমি সহকারী কমিশনার মহাদয়ের আর কিছুই করার থাকে না। কমিশনার সাহেবও তখন তাদের তালে তাল মিলিয়ে স্বাক্ষর করতে একপ্রকার বাধ্য হন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাভার সদর ইউনিয়নের কলমা মৌজার বিআরএস ৪ নম্বর খতিয়ানের ১০১, ১০২, ১০৩, ১১১ ও ১১৩ নম্বর দাগের ১৪৫ শতাংশ জমি মূলত কোর্ট অব ওয়ার্ডস, ঢাকা নওয়াব এস্টেট-এর নামে রেকর্ডভুক্ত। সরকারি এই সম্পত্তি গ্রাস করতে কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতে একটি মামলা করেন।
অথচ এই মামলার নকল রায় তৈরি করে মামলার বাদী কফিল উদ্দিন ভূঁইয়াকে ১১ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদের মাধ্যমে সাভার উপজেলা সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) জহিরুল আলম কে দিয়ে নামজারি করিয়ে দেন। আর এতে সহমত পোষণ করেন মিস কেস সহকারী মিরাজ হোসেন খান, নায়েব আবুল কালাম আজাদ এবং উমেদার জাহাঙ্গীরসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ।

অবশ্য এমন ভয়াবহ জালিয়াতি গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর বর্তমান সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন ওই নামজারি বাতিল ঘোষণা করেন।

কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারির ঘটনা ফাঁসের পর তড়িঘড়ি করে নামজারি বাতিল করা হলেও, সংশ্লিষ্ট জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উলটো ভূক্তভোগী মো. বাদশা মিয়া তার বৈধ রায়ের ভিত্তিতে নামজারি করতে গেলে ভূমি অফিসের ওই সিন্ডিকেট তার কাছেও মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন।

ঘুষ না দেওয়ায় এখন ১৮৫/২৫ মিস কেসের মূল নথিই অফিস থেকে গায়েব করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ।

বাগধনিয়া তহশিল অফিসের নায়েব ও ওমেদার ভলিয়মে জমি নেই অজুহাত দেখিয়ে দিনের পর দিন হয়রানি করছেন।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মিস কেস সহকারী মিরাজ হোসেন খান ও কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চক্র দীর্ঘদিন ধরে সাভার ভূমি অফিসে ঘুষের রাজত্ব কায়েম করেছে। টাকা দিলে সরকারি খাস জমিও ব্যক্তির নামে হয়ে যায়, আর টাকা না দিলে বৈধ রায়ের ফাইলও হারিয়ে যায়।

সাবেক এসি ল্যান্ড জহিরুল আলম বর্তমানে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিষয়ে তিনি মুঠোফোনে বলেন, সাভারে এসি ল্যান্ড হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে অনেক মিস কেস নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এই বিষয়গুলো এখন ঠিক মনে পড়ছে না। ১১ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, যেহেতু মিস কেসের বিষয়টি মনে নেই। তাই টাকা লেনদেন বিষয়টি বলা অবান্তর।

সাভার এসিল্যান্ড অফিসে সেবা নিতে আসা অসহায় ভূমি মালিকদের মুখে মুখে শোনা যায় ‘অত্র অফিসের মহা ঘুষখোর প্রাণিদের নাম সার্ভেয়ার আব্দুল করিম, মিস কেস সহকারী মিরাজ হোসেন ও কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদ । নামজারি নথি বা কেইস বাতিল করে যেন ভবিষ্যতে কোনো জবাবদিহির মখোমুখি না হতে হয় তার জন্য বহু অপকৌশল তাদের নিজস্ব ফরমেটে তৈরি করা আছে।

একটা নির্ভেজাল কাজে তাদের চাহিদা মতো টাকা না পেলে নামজারি বাতিলের সুপারিশ এমন ‘মূল কাগজপত্র বা দলিল প্রদর্শন না করায় অত্র নামজারি না মঞ্জুর করা যেতে পারে’! অথচ, তাদের সিন্ডিকেট বাহিনির বেলায় এ ধরনের কোনো অযুহাত নেই এবং সারাদিনে দু চারটি মূল দলিল বা মূল কাগজ দেখেছে এরকম নজির খুবই কম। আবার হয়তো কারো কারো নামজারি নথিতে মনগড়াভাবে লিখে রাখে নকশা, পেন্টা লাগবে বিধায় না মঞ্জুরের সুপারিশ! আবেদনকারী নিজে উপস্থিত না থাকায়; না মঞ্জুরের সুপারিশ! অথবা দলিল দাতার/গ্রহীতার বাবার/মায়ের নামের এক অক্ষর ভুল বা এ-কার নাই, আ-কার নাই বা ও-কার নাই, এইসব নিয়েও না মঞ্জুরের সুপারিশ করা হয়!

ওয়ারিশিয়ান সার্টিফিকেট ছয় থেকে এক বছরের পুরোনো হলেই তারা সরকারি নির্দেশনা দেখাবে যে- চলবে না, নিম্নতম তিন মাসের আপডেট লাগবে। সাধারণ পাবলিকের কাজে এরকম আপডেট কাগজ না থাকলেও নামজারি বাতিলের সুপারিশ করা হয়! অথচ, এমনও খারিজ ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে; যার ওয়ারিশিয়ান সার্টিফিকেট একদম জাল, ফুটপাত থেকে বানানো, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তা কোনো স্থানীয় চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র কর্তৃক প্রদত্ত নয়!

সেবাপ্রার্থী লোকজনের মুখ থেকে জানা যায় ‘তারা এখানে এসেছে শুধু টাকা কামাতে। এখান থেকে যা পারে কামিয়ে নিয়ে অন্য কোথাও বদলি হয়ে যাবে’। একই কাগজ বা দলিল পর্চা দিয়ে আবেদনকৃত বহু নামজারি কেইস বাতিল হয়েছে শুধুমাত্র নির্ধারিত ঘুষের টাকা না দেওয়ার অপরাধে?

সেই একই কাগজপত্র ও দলিল পর্চা দিয়ে পূনরায় আবেদন করে যথাযথভাবে সার্ভেয়ার কানুনগো নির্ধারিত ফি পরিশোধে খারিজ ডেলিভারি নেওয়ার নজির আছে শত শত!

তাদের সেই নির্ধারিত ফিস গ্রহণের জন্য আছে নিজস্ব জনবল ও গোপন হিসাবের খাতা। সে খাতা এবং নগদ টাকা জমা রাখেন সিন্ডিকেট বাহিনির মো: শাহরিয়ার আকাশ নামের এক অফিস সহকারী।

উপরে বর্ণিত অপরাধগুলো খুবই সামান্যতম মনে হবে যদি শোনা যায় কাজের ধরন বুঝে ঘুষের টাকার অংক নির্ধাারণ করে দেওয়া হয়! ডিসিআর ফি সরকার নির্ধারিত ১১৫০ টাকা বর্তমানে অনলাইনে জমা নিলেও নাজির শাখায় এক্সট্রা ৫০০-৭০০ টাকা জমা দিয়ে তারপর আগত ও চলমান জোত খতিয়ান পোষ্টিং নিতে হয়। নামজারির সর্বশেষ ধাপে এসে উক্ত বর্ণিত নামজারির ফি বাদে এক্সট্রা টাকাটা না দিলে জোত খতিয়ান আর পোষ্টিং দেওয়া হয় না। ফলে অনলাইন থেকে ডিসিআর এর ১১৫০ টাকা জমাদানের যে সরকারি ম্যাসেজ, তা আর গ্রাহকের মোবাইলে আসে না

কয়েকদিন পরে সেবাগ্রহীতা জানতে পারে, পেন্ডিং জটিলতার কারণে তার নামজারি জমাভাগের প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়েছে! এই সমস্যাটি সাভার উপজেলা ভূমি অফিসে বর্তমানে মারাত্মক ভয়াবহ ও মহামারীর রূপ ধারণ করেছে! এর সম্পূর্ণ দায়ভার ও দোষ চাপানো হচ্ছে সাধারণ জনতার কাঁধে। বলা হচ্ছে- সময়মত ডিসিআর ফি জমা না দেওয়ায় অটো বাতিল হয়েছে!

অথচ, ডিসিআর ফি জমা দেওয়ার কোনো ম্যাসেজ-ই আসেনি। মূলত অফিসের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কানুনগো সাহেব যাকে যেখানে যেভাবে সেটিং করে দিয়েছে, সে সেভাবেই তাদের সিন্ডিকেটের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, জনগণের কথা ভাবার মতো সময় তাদের নেই। সে জন্য নেজারত শাখায় ঢুকলেই দেখা যায় এখানে কেউ হয়তো কাজ করতে আসেনি, মনে হয় সবাই বিকাশ, রকেট ও নগদের ডিলারশীপ নিয়ে দিব্যি ব্যবসা করছেন! সার্ভেয়ার ও কানুনগো’র সাথে কাজ করা একজনের সাক্ষাৎকারে জানা যায় (যা গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত), ভূমি সহকারী কর্মকর্তাসহ পুরো এসিল্যান্ড অফিসটাকে আঙ্গুলে তুলে নাচাচ্ছেন কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদ, মিস কেস সহকারী মিরাজ হোসেন ও সার্ভেয়ার মোঃ আব্দুল করিম!

উনার সামনেই নাকি কানুনগো জিয়া উদ্দিন সাহেব একদিন এসিল্যান্ডকে বলেছেন আপনার কিছু বোঝার দরকার নাই, অফিস কিভাবে চালাতে হয়, আপনে শুধু দেখবেন। এসিল্যান্ড স্যার খুব ভালো ও সরলসোজা হওয়ার জন্যে সার্ভেয়ার-কানুনগো’রা তার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খেতে পারছে। তার ওপেন সিক্রেট কথায় জানালো সার্ভেয়ার ও কানুনগো’র টেবিলে বিভিন্ন কাজের রেট। বি আর এস খাস দাগ ১৫ হাজার টাকা, এস এ, আর এস ৮নং রেজিস্টার দাগ হলে ১৫ হাজার টাকা, এল এ দাগ ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা, খ তালিকা হলে ৩ থেকে ৫ হজার টাকা, নির্ভেজাল প্রতি পিছ কাজের রেট ১ হাজার টাকা!

তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও অহমিকামূলক কথাবার্তায় বোঝা যায়; তারা এসিল্যান্ড অফিসে রাজ করতে এসেছে, লুট করতে এসেছে এবং শোষন করতে এসেছে! তারা কোনো পাবলিক সেবা দিতে আসেনি! সাধারণ ভূমি জোতদারগণ সেবা পেতে এসে ক্ষীপ্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। রাগে ক্ষোভে কেউ কেউ সার্ভেয়ার ও কানুনগো অপসারণের জন্য মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

You cannot copy content of this page