এখনো তিনারা বহাল তবিয়তে, কেউ কেউ অবসরে চাপা টেনশনে


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৮, ২০২৬, ৯:১০ AM /
এখনো তিনারা বহাল তবিয়তে, কেউ কেউ অবসরে চাপা টেনশনে

তবে আলোচিত ও দেশের শীর্ষতম লুটেরাদের অনেকের নামে আজও মামলা না হওয়ায় বিস্মিত ভূক্তভোগীসহ সচেতন মহল

সজীব আকবর, অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:

শত-শত কোটি টাকা লুটপাটে অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজ সাব রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে নামমাত্র গোপন তদন্ত হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। তাছাড়া দেশসেরা লুটেরা সাব রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারদের মধ্য অন্যতম আলোচিত বরিশাল সদর খ্যাত ভূয়া সাব রেজিস্ট্রার ল অসীম কল্লোল, প্রয়াত আওয়ামী নেতা তোফায়েল আহম্মেদের সুপারিশকৃত বাগেরহাট মোংলার ভূয়া সাব রেজিস্ট্রার স্বপন কুমার দে, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রিয়জন খ্যাত কথিত ক্যাশিয়ার সাব রেজিস্ট্রার থেকে মুন্সিগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত রমজান খান, রাজধানীর  পল্লবী থেকে সদ্য রাজিবপুরে বদলিকৃত সাব রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার বিশ্বাস প্রমূখ।

সাম্প্রতিক সময়ে একমাত্র ঢাকার সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম কিছুদিনের জন্য কারাভ্রমণে গেলেও বাদবাকিরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম কারাগারে যাওয়ার পর ভূমি রেজিস্ট্রেশনের সাব-রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার এবং খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে সাময়িক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও ধীরেধীরে সে আতঙ্ক কেটে যেতে শুরু করেছে। অভিযুক্তরা কেউ কেউ অবসরে যেয়ে দুর্নীতি আর জাল জালিয়াতির টাকায় বিলাসী ও আয়েসি জীবন উপভোগ করছেন। এদের মধ্যে বর্তমান ও সাবেক অনেকেই গুলশান বনানী সহ ঢাকা ও চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকার বারে গোপনে ক্যাসিনোতে নিয়মিত যাতায়াত করছে। একত্র হয়ে নিজেদের মধ্যে নানাবিধ শলাপরামর্শে আইনের চোখে ধূলো দেওয়ার ধারাবাহিক পায়তারা অব্যাহত রেখেছেন।
বিশেষ করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন,জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারিকৃত জমির রেজিস্ট্রেশন, নানা সঙ্কটে ফেলে নিকাহ রেজিস্ট্রার, ভেন্ডার ও ডিডরাইটারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ পদ্ধতিগত দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করে এরা এখন ডাকসাইটে প্রভাবশালী কেউকেটাতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ এবং সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত অসংখ্য প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব দুর্নীতিগ্রস্ত জেলা রেজিস্ট্রার(DR) ও সাব রেজিস্ট্রারদের(SR) বিরুদ্ধে খাতাকলমে দীর্ঘদিন যাবৎ অনুসন্ধান করছে দুদক। বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থের বিনিময়ে দুদকের কতিপয় ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে অনুসন্ধান-তদন্ত দীর্ঘদিন ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে BRSA এর সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করলেও বাদবাকিরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। ৩০শে এপ্রিল ২০২৪ অহিদুল ইসলাম আত্মসমর্পন করে জামিন প্রার্থনা করেন। ওইদিন চার্জশিট গ্রণের বিষয়ে শুনানি ছিলো। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। তবে কারাগারে পাঠালেও অহিদুল ইসলাম রীতিমতো ভিআইপি মর্যাদায়ই ছিলেন কারাগারে।

তৎকালীন BRSA সভাপতি রেজিস্ট্রেশন সেক্টরের প্রভাবশালী নেতার কারবাসে আতঙ্ক নেমে আসে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে। তবে সে আতঙ্ক এখন আর তেমন নেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব রেজিস্ট্রারদের মধ্যে। তাই এখন তিনারা আনন্দ ভ্রমণ, বিদেশ সফর আর সুরা-সাকিতে বিলাসী জীবন ভোগ করছেন।

ফলে সামগ্রিক সিদ্ধান্তের আওতায় দুর্নীতিপ্রবণ খাত হিসেবে পরিচিত আইনমন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রেশন সেক্টরের ফাইলগুলো রি-ওপেন করে এদের যথাযথ শাস্তি ও স্থাবর অস্থাবর সম্পদ এবং পাসপোর্ট জব্দ করাটাই হবে এখন “সময়ের সঠিক পদক্ষেপ”।

সূত্র জানায়, দুদকে রেজিস্ট্রেশন সেক্টরের সাব- রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার, নকলনবীশ, দলিল লেখকসহ দেড় শতাধিক অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান বর্তমানে চলমান রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে কিশোরগঞ্জ সদর খ্যাত ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা তথা মুজিবনগর সরকারের কথিত কর্মচারী সাব-রেজিস্ট্রার মিনতী দাস, ঢাকা উত্তরাখ্যাত সাব রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লা(বর্তমান নীলফামারীর জলঢাকা), নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার সাব রেজিস্ট্রার সাজ্জাদ হোসেন,গাজীপুর শ্রীপুরের সাব রেজিস্ট্রার ওসমান গনি মন্ডল, কালিয়াকৈর সাব রেজিস্ট্রার নূর আমিন, চট্টগ্রাম রাউজান খ্যাত সাব রেজিস্ট্রার আবু তাহের মো: মোস্তফা, নারায়ণগঞ্জ, সোনার গাঁও সাব রেজিস্ট্রার মজিবুর রহমান, সিলেট মৌলভীবাজার সদর সাব রেজিস্ট্রার ইয়াসমিন সিকদার, ও বর্তমান সময়ের চিহ্নিত লুটেরা বিমানে করে অফিস যাতায়াতকারী ঢাকার মোহাম্মদপুরের আলোচিত সাব রেজিস্ট্রার শাহীন মিয়া( ঝিকরগাছা, যশোর) এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান চলছে।

এছাড়া জয়পুরহাটের আলোচিত জেলা রেজিস্ট্রার তোরাব হোসেন, কুমিল্লার জেলা রেজিস্ট্রার আসাদুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁও জেলা রেজিস্ট্রার মো: হেলালউদ্দিন, শেরপুর জেলা রেজিস্ট্রার নূর নেওয়াজ, ময়মনসিংহ জেলা রেজিস্ট্রার পথিক কুমার সাহা, চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার মিশন চাকমা(সাবেক), যশোর জেলা রেজিস্ট্রার আবু তালেব, ঝিনাইদহের জেলা রেজিস্ট্রার সাব্বির হোসেন, মেহেরপুর জেলা রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম, গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহার, বগুড়ার জেলা রেজিস্ট্রার রফিকুল ইসলাম, পঞ্চগড় জেলা রেজিস্ট্রার মো: রেজাউল করিম বকশি, নারায়ণগঞ্জ খ্যাত বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার BRSA সভাপতি জামিলুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান এবং মামলার তদন্তও খাতাকলমে চলমান রয়েছে।

তবে ভূক্তভোগী ও সচেতন মহলের অভিযোগ বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দুদকের একশ্রেণির দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারির সহযোগিতায় দুর্নীতিবাজদের অনেকেই অনুসন্ধান ও তদন্তের নথি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন। বর্তমান কমিশনের চাপে সেগুলো এখন আবারও সক্রিয় হচ্ছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতির বিষয়ে আমাদের অবস্থান জিরো-টলারেন্স। পেন্ডিং তদন্ত-অনুসন্ধানগুলো শেষ করার জন্য ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
আর নতুনভাবে যারা দফায় দফায় সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধেও ভূক্তভোগীদের অভিযোগ সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নিবে দুদক। এছাড়া সারাদেশে দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযান চলমান।

You cannot copy content of this page