ঘুষ দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড জাকারিয়ার নেতৃত্বে রাজউক যেন লুটপাট বাণিজ্যের অভয়ারণ্য 


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : মার্চ ২৫, ২০২৬, ৫:০৬ AM /
ঘুষ দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড জাকারিয়ার নেতৃত্বে রাজউক যেন লুটপাট বাণিজ্যের অভয়ারণ্য 

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঢাকা মহানগরের পরিকল্পিত নগরায়ন ও উন্নয়নের জন্য দায়বদ্ধ একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। পতিত শেখ হাসিনা আমল থেকে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে এর ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিশেষ করে রাজউকের জোন-৪-এর পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে উঠা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগগুলো এখন জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন গোপন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাকারিয়ার অধীনে রাজউকের জোনাল অফিসগুলো কার্যত দুর্নীতির ‘সেফ জোনে’ পরিণত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাজউকে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, সালেহ আহমেদ জাকারিয়া বর্তমানে রাজউকের জোনাল অফিস মহাখালীতে জোন-৪ এর পরিচালকের দায়িত্বে থাকলেও অনেক সময় তাকে জোন-৩ এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। মিরপুর, গুলশান, বনানী ও উত্তরার মতো সব অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তার প্রশাসনিক আওতাধীন হওয়ার কারণে এখানে অবৈধ উপার্জনের সুযোগ অনেক বেশি। অভিযোগ রয়েছে, এই জোনগুলোতে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়। তার নির্দেশ ছাড়া কোনো বড় ফাইল নড়ে না এবং প্রতিটি ফাইলে ‘ম্যানেজমেন্ট ফি’ হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়।

এদিকে সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার দুর্নীতির অন্যতম স্তম্ভ হলো রাজউকের ‘ইমারত পরিদর্শক’ সিন্ডিকেট। সূত্র মতে, তিনি একদল অসাধু ইমারত পরিদর্শককে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই পরিদর্শকরা এলাকায় কোনো নতুন ভবনের কাজ শুরু হলে সেখানে গিয়ে ত্রুটি খুঁজে বের করেন এবং ভবন মালিককে জোন অফিসে পরিচালকের সাথে ‘যোগাযোগ’ করার পরামর্শ দেন। যারা টাকা দিতে রাজি হন না, তাদের ভবনের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয় কিংবা অবৈধভাবে ভবনের নকশা বহির্ভূত অংশ ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। রাজউকের এই জোনাল অফিসে অভিযোগ রয়েছে যে, পরিদর্শকরা প্রতি মাসে সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ সরাসরি পরিচালক জাকারিয়ার হাতে তুলে দেন। এই অর্থ বাণিজ্য এতই সুসংগঠিত যে, এটা অনেকেই ‘প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি’ হিসেবে অভিহিত করেন।

সুত্র জানায়, সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার ক্ষমতার দাপট এতটাই যে, তার অধীনে কর্মরত কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালাতেও দ্বিধাবোধ করেন না। ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইমারত পরিদর্শক মো. সোলাইমান হোসেন নিজ কক্ষে একজন সংবাদকর্মীর ওপর হাতুড়ি দিয়ে হামলা চালান। অভিযোগ রয়েছে, এই হামলার ঘটনাটি পরিচালকের প্রত্যক্ষ মদতে কিংবা তাকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছে। হামলার সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শী থাকা সত্ত্বেও পরিচালক জাকারিয়া বিষয়টিকে ‘তুচ্ছ ঘটনা’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের পক্ষ নেওয়ায় রাজউকের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

প্রশাসনিক অনিয়মের আরেকটি বড় নজির হলো অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো। অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে মাত্র এসএসসি পাস করা আব্দুর রহিমকে জোন-৩ এর প্রধান ইমারত পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন জাকারিয়া। যেখানে এই পদের জন্য প্রকৌশল বিদ্যা বা উচ্চতর ডিগ্রি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, সেখানে শুধুমাত্র ‘ম্যানেজমেন্ট’ ক্ষমতার জোরে একজন শিক্ষাগতভাবে অযোগ্য ব্যক্তিকে এমন পদে আসীন করা হয়েছে। এটি সরাসরি রাজউকের সার্ভিস রুলস এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তার প্রতি বড় ধরনের হুমকি। অনেক যোগ্য প্রকৌশলীকে অবমূল্যায়ন করে নিজের অনুগত ও দুর্নীতিতে পারদর্শী ব্যক্তিদের পদায়নের মাধ্যমে তিনি তার ব্যক্তিগত ‘আর্থিক সাম্রাজ্য’ সুসংহত করেছেন।

সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো, তিনি বৈধ ভবন মালিকদের নানা অজুহাতে নোটিশ পাঠিয়ে হয়রানি করেন। সাধারণত কোনো ভবনে সামান্য বিচ্যুতি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার বিধান থাকলেও তার নির্দেশে সরাসরি উচ্ছেদ অভিযানের ভয় দেখানো হয়। পরবর্তীতে দালাল বা অসাধু কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। বিশেষ করে বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ড বা বনানীর অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় দুর্ঘটনার পর তিনি পরিদর্শন বাড়ানোর নামে রেস্টুরেন্ট এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করেছেন বলে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে বাস্তবে ঝুঁকি কমানোর জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার জীবনযাপন অত্যন্ত রাজকীয়। বিভিন্ন গোপন সূত্রে এবং প্রশাসনিক মহলে প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি নিয়মিত অভিজাত ক্লাব, লাউঞ্জ ও বারগুলোতে যাতায়াত করেন। তার মদ্যপান ও নারীসঙ্গ নিয়ে নানা বিতর্কিত কাহিনী রাজউকের অলিগলি ছাড়িয়ে এখন মন্ত্রণালয়ের কানেও পৌঁছেছে। দেশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এমন নৈতিক দেউলিয়াত্ব কেবল তার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য চরম অবমাননাকর। তার এই ভোগবিলাসের অর্থের উৎস মূলত রাজউকের গ্রাহক হয়রানি ও অবৈধ নকশা অনুমোদন থেকে আসা অর্থ।

যখনই গণমাধ্যমকর্মীরা বা অভিযোগকারীরা এই পরিচালকের দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলতে চান, তিনি তা এড়িয়ে যান। সাংবাদিকদের ফোন কল রিসিভ না করা, কল কেটে দেওয়া কিংবা অশালীন আচরণ করা তার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাজউকের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও অদৃশ্য কোনো এক শক্তির বলে তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজউকের ঊর্ধ্বতন মহল এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার জন্য একটি বিশেষ তহবিল বজায় রাখেন। এর ফলে তার বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী প্রশাসনিক তদন্ত আলোর মুখ দেখতে পায় না।

সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার মতো কর্মকর্তাদের কারণে রাজউক আজ জনগণের কাছে একটি ‘আতঙ্কের নাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পরিকল্পিত ঢাকা গড়ার বদলে তিনি ঢাকাকে অপরিকল্পিত ও অনিরাপদ নগরে পরিণত করছেন শুধুমাত্র নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন:

১.দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
২. জোন-৩ ও ৪ এ তার আমলে কতগুলো ভবনের নকশা পাশ হয়েছে এবং কতগুলো অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে তার একটি উচ্চতর অডিট করা প্রয়োজন।
৩. সাংবাদিক হেনস্তাকারী এবং অযোগ্য পদে পদায়নকৃত কর্মকর্তাদের অবিলম্বে অপসারণ করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৪. রাজউকের পুরো সিস্টেমকে ডিজিটাল করার মাধ্যমে মানবিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে।

সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে রাজউকের ভেতরে দুর্নীতির যে মহীরুহ তৈরি হয়েছে, তা সমূলে উৎপাটন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রকৃত প্রতিফলন ঘটানোর এখনই উপযুক্ত সময়।

এব্যাপারে মন্তব্য জানতে পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেনি।