
আমার এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ পোস্টটি পড়ে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নড়েচড়ে বসা উচিত। কিন্তু তাঁরা সেটা তো করবেনই না, উল্টো নানা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য ছুঁড়ে দিতে পারেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলবেন- আপনাদের এই গবেষণা কি চিকিৎসাবিজ্ঞান স্বীকৃত? কোনো গ্রহণযোগ্য মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেকে তো (বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী চিকিৎসকগণ) মানতেই চাইবেন না যে, বিনা অপারেশনে শুধুমাত্র লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে আর আদর্শ খাদ্যাভ্যাস কঠোরভাবে মেনে চলে পিত্তথলির দুইটি বড় বড় পাথর (যার একটির আকৃতি ১২ মিলিমিটার, আরেকটা ৯ মিলিমিটার) মাত্র দুই বছরে গলিয়ে তথা উধাও করে ফেলা সম্ভব হয়েছে (কেননা তাঁদের তো এমন প্রাকৃতিক চিকিৎসা বিষয়ে কোনো ধারণাই নেই)!
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সুদীর্ঘ দুই বছরব্যাপী চলমান এই প্রাকৃতিক চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় কোনো MBBS ডাক্তার যুক্ত ছিলেন না (যদিও রোগীনির নিজের মেয়ে একজন MBBS ডাক্তার; বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করে উন্নত হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় যুক্ত); পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা তত্ত্বাবধান করেছেন বাংলাদেশের কয়েকজন গুণী প্রকৃতিক চিকিৎসা (ন্যাচারোপ্যাথি) অনুশীলনকারী।
আলোচ্য রোগীনি দুই বছর আগে (১/০৪/২১ তারিখে) রুটিন চেকআপ করাতে গিয়ে প্রথম জানতে পারেন যে, তাঁর পিত্তথলিতে দুইটি বড় আকৃতির পাথর রয়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদন দেখে চিকিৎসক বললেন, অনতিবিলম্বে অপারেশন করে পাথর অপসারণ করতে হবে। নইলে বড় ধরনের মাশুল দিতে হতে পারে- এই পাথর আরো বড় হয়ে ভোগাবে এবং একপর্যায়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মরতে হবে।
প্রচলিত চিকিৎসা-ব্যবস্থাপকেরা মুখে যদিও বলেন, পিত্তথলির পাথর অপসারণ করতে হবে। কিন্তু আসলে তাঁরা যেটা করেন, তাহলো পুরো পিত্তথলিটাই কেটে ফেলে দেন। কেননা পাথরের আকার দুই মিলিমিটারের বেশি হয়ে গেলে সেটি আর বের করা যায় না। তখন পিত্তথলি ফেলে দেওয়া ছাড়া প্রচলিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাতে বিকল্প কোনো উপায় থাকে না।
পিত্তাশয় (Gallbladder) অথবা পিত্তথলি বা পিত্তকোষ পরিপাকতন্ত্রের নাশপাতি আকৃতির একটি ফাঁপা অঙ্গ- যা যকৃতের ডানখন্ডের নিম্নতলে উদরের আবরক ঝিল্লিহীন খাঁজে তির্যকভাবে অবস্থান করে। এটি পোর্টা-হেপাটিস এর ডান প্রান্ত থেকে যকৃতের নিম্নকিনারা পর্যন্ত বিস্তৃত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭-১০ সে.মি. এবং প্রস্থ ৩ সে.মি.। খাদ্য পরিপাকে ব্যবহারের জন্য এটি একবারে ৩০-৫০ মিলিলিটার পিত্তরস ধারণ করে রাখে। পিত্তের কারণে এর রঙ গাঢ় সবুজ দেখায়। পিত্তনালীর মাধ্যমে এটি যকৃৎ ও ডিওডিনাম-এর সঙ্গে যুক্ত। পিত্তরস কলিজায় তৈরি হয়ে পিত্তথলিতে এসে জমা হয়। সেখান প্রয়োজনুসারে অন্ত্রে প্রবেশ করে চর্বি হজমে কাজ করে। এছাড়া অন্ত্রের এসিড ও ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা করে।
পিত্ত বা বাইল অনেক জৈব উপাদানের সমষ্টিতে তৈরি। বাইল সল্ট, বিলিরুবিন ও কোলেষ্টেরল এর প্রধান জৈব উপাদান। পিত্তরসের ৮০% বাইল সল্ট। প্রতিদিন ৬০০ মিলিগ্রাম পিত্তরস তৈরি হয়। কলিজায় উৎপন্ন বাইল পিত্তথলিতে জমা হয়। পিত্তথলি থেকে এটি অন্ত্রের ভিতর প্রবেশ করে। এটি শুধু অন্ত্রের চর্বিযুক্ত খাবারকে দেহের সার্কুলেশন সিসটেমে ঢুকিয়ে দেয়। কোনো কারণে পিত্তথলির জমাকৃত পিত্ত খালি না হয়ে জমা থাকলে সেটি পাথরে পরিণত হয়। এটিকেই গলস্টোন বা পিত্তপাথরি বলে। পিত্তে জমাকৃত কোলেষ্টরেলের পরিমাণ বাড়লে পিত্তথলিতে পাথর হতে পারে। এছাড়া স্থূলতা, ডায়বেটিস, কোলেষ্টরেলযুক্ত খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম না করা, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল সেবন, শাক-সবজি ফলমূল না খাওয়া পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার নেপথ্য কারণ।
পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বুঝতে গেলে মানবদেহে ক্ষার ও এসিড-এর ভারসাম্য সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। এক কথায় যাকে Potential of Hydrogen (pH) বলে। এই pH-এর ভারসাম্য ঠিকমতো বজায় রাখতে না পারলে পিত্তথলিতে পাথর হবেই আর একবার পাথর হয়ে গেলে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাতে সেটি গলানোর মতো কোনো ড্রাগ নেই। তাঁরা পারেন কেবল পিত্তথলি কেটে ফেলে দিতে। বলাবাহুল্য যে, এই অপারেশন করে ডাক্তার মোটা অংকের টাকা পান। সেজন্য তাঁরা পিত্তথলি ফেলে দেওয়ার জন্য রোগীদেরকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। ক্ষেত্রবিশেষে এই বলে ভয় দেখান যে, পিত্তথলি রেখে দিলে সেটা ক্যান্সারে রূপ নেবে। তখন বাঁচানোর কোনো উপায় থাকবে না (এই সময় ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করা উচিত- তাহলে পিত্তথলি কেটে ফেলে অমরত্ব লাভ করা যাবে কিনা? কিন্তু সেটা তো কেউ জিজ্ঞেস করেন না)!
পিত্তথলি কেটে ফেলে দিলেও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। কেননা সার্জন পিত্তথলি বাদ দিয়ে পিত্তনালী সরাসরি অন্ত্রে সংযুক্ত করে দেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় শরীরে নানা জটিলতা তৈরি হয়- যেটা ডাক্তাররা আগে কখনোই বলেন না (বলবেন কিভাবে, সেই অভিজ্ঞতা তো তাঁদের নেই। তাঁরা খালি হিসেব কষেন কয়টা পিত্তথলি কেটে দিনে কত টাকা আয় করবেন)। সার্জন পিত্তথলি বাদ দিয়ে পিত্তনালী সরাসরি অন্ত্রে সংযুক্ত করে দিলে পিত্তরস কলিজা থেকে সরাসরি অন্ত্রে প্রবেশ করে। কিন্তু এতে যে নানাবিধ স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি হয়, সেগুলো বিদ্যমান থাকে মৃত্যু অবধি (যেমন : রোগীর অস্বাভাবিক গরম অথবা ঠান্ডা লাগে, রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা কমে যায়)।
আমাদের সর্বদা স্মরণে রাখা উচিত যে, মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সেরা জীব হচ্ছে মানুষ। বলা হয়ে থাকে- আল্লাহ্ ‘কুন’ উচ্চারণ করে সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি যথেষ্ট সময় নিয়ে তাঁর কুদরতি হাতে পরম যত্নে মানবদেহ তৈরি করেছেন। আল্লাহ’র তৈরি নিখুঁত মানবদেহ থেকে খেয়ালখুশিমতো পিত্তথলি কেটে ফেলা কতখানি যৌক্তিক- সেটাও আমাদের ভেবে দেখা দরকার বৈকি। যেখানে পবিত্র কোরআনে একাধিকবার আল্লাহ বলছেন, আমি কোনো কিছুই অনর্থক তৈরি করিনি
[সূত্র : ১৫:৮৫-৮৬, ২১:১৬, ২৩:১৭, ৩৮:২৭, ৪৪:৩৮-৩৯ নং আয়াতসমূহ]।
ডাক্তার পিত্তথলি কেটে বাদ দেন এই যুক্তিতে যে, ভবিষ্যতে যেন পাথর জমা হওয়ার সুযোগ না পায়। কিন্তু সঠিক প্রাকৃতিক খাবারে দেহকে চালনা করলে পিত্তথলিতে কখনোই পাথর হবে না। আপনি সারাজীবন ভুলভাল জীবনযাপন করবেন আর উল্টাপাল্টা খাবেন, তারপর পিত্তথলিতে পাথর হলে কেটে বাদ দেবেন- এটা কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনচার হতে পারে না!
আমাদের আলোচ্য রোগীনি সেটাই চাইলেন- পাথর আছে বলেই পিত্তথলি কেটে বাদ না দিয়ে ব্যাথা অনুভব না করা পর্যন্ত শেষ চেষ্টা চালিয়ে দেখা যাক। তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস ছিল- যে থলি পাথর তৈরি করতে পারে, উপযুক্ত পরিবেশ দিতে পারলে এবং পাথর হওয়ার কারণ দূর করতে পারলে সেই থলি পাথর গলাতেও পারবে। এই চিন্তা থেকে রোগীনি শুরু করলেন কঠোর সাধনা। ভুলভাল জীবনচার পরিত্যাগ করলেন। সময়মতো ঘুমাতে গেলেন এবং ভোরবেলা জেগে উঠলেন। পরিশ্রম করে ঘাম ঝরালেন। ভাজা-পোড়া, তেল, চিনি, ফাস্টফুড খাওয়া বাদ দিলেন। তার বদলে প্রতিদিন সঙ্গী করে নিলেন বিষমুক্ত টাটকা শাক-সবজি, ফলমূল আর সবুজ পানীয়। বিশেষ ঔষধি খাবার হিসেবে কখনো কাঁচা, কখনো সিদ্ধ আমপাতার রস নিয়মিত সেবন করতেন। শীতকালে পান করতেন কচি গমের চারার রস। এর পাশাপাশি তিনি আরো দু’টি দিকে মনোযোগী হলেন- ১. দোয়া ও ২. দান। মানে প্রতিবেলায় নামাজ আদায়ান্তে পিত্তথলির পাথর অপসারণের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার বিশেষ কৃপা প্রার্থনা করতেন আর একই উদ্দেশ্যে নিয়মিত দান করতেন।
এভাবে চলতে শুরু করার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পিত্তথলির পাথর ক্রমশ ছোট হতে শুরু করে। নয় মিলিমিটারের পাথরটি আগেই গলে যায়। অন্যদিকে ১২ মিলিমিটারের পাথরটি প্রথমে ৫.১ মিলিমিটার (৫/০১/২২ তারিখের প্রতিবেদন), তারপর ৪ মিলিমিটার (২৪/১১/২২), সবশেষে একেবারে নাই হয়ে গেছে (১/০৫/২৩ তারিখের প্রতিবেদন)। প্রমাণস্বরূপ আল্ট্রাসনো প্রতিবেদনগুলো সংযুক্ত করলাম।
যাঁরা পিত্তথলির পাথর সমস্যায় ভুগছেন, চিকিৎসা ব্যবসায়ীদের প্ররোচনায় অপারেশন করানোর আগে অন্তত কিছুদিন এই প্রাকৃতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে দেখতে পারেন- সুফল পাচ্ছেন কিনা? বিশেষভাবে স্মরণে রাখবেন- পিত্তথলির পাথর অপসারণের নামে পিত্তথলি কেটে ফেলে দেওয়াটা কোনো বাহাদুরি নয়!

লেখক, গবেষক, বিক্রয়বন্ধু,
অভিনেতা, আলোচক ও
প্রাকৃতিক চিকিৎসা বিশ্লেষক।।






















You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :