
সজীব আকবর, অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
তার সঙ্গে আছেন আরেক উমেদার রাজিব, দু’জনে মিলে পুরো অফিসকে পরিণত করেছেন দুর্নীতির অভয়ারণ্যে। উমেদার রাজিব ও কথায় কথায় ঘুষ নেন। ঘুষের টাকা দিয়ে তিনি রাজধানীতে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট গড়ে তুলেছেন। এ বিষয়ে রাজিব বলেন, “পরিশ্রম করলে টাকা আসবেই”। “মানুষের উপকার করি বলে মানুষও আমাকে টাকা দেয়, ওই টাকা দিয়ে বাড়ি-গাড়ি করেছি।”

এদিকে ১০ ই ফেব্রুয়ারি ২০২৫ গাজীপুর নিবাসী ময়মনসিংহের ত্রিশাল ফেরৎ আলোচিত সাব রেজিস্ট্রার জাহিদুল হক ( L.L.M) আরেক লুটেরা সাব রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হন। পল্লবীতে কর্মরত থাকাকালীন প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ২৯শে ডিসেম্বর বাউনিয়া মৌজার ১০ শতাংশ বাণিজ্যিক প্লট শ্রেণী পরিবর্তন করে বোরোধান সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনায় ব্যাপক প্রচার প্রচারণা শুরু হলে জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান এর তড়িৎ হস্তক্ষেপে নিবন্ধন অধিদপ্তর তড়িঘড়ি করে প্রদীপ কুমার বিশ্বাস কে চররাজিবপুর বদলি করে দেন। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রদীপ কুমার পল্লবী সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকে প্রায় ১৮/২০ কোটি লুটে নিয়ে যান বলে তার পল্লবীর স্টাফরাই মাঝেমধ্যে আলোচনা সমালোচনা করে থাকে। জাহিদুল হক যোগদান করলে ভূক্তভোগীরা মনে করেছিলেন আইনশাস্ত্রে L.L.B অনার্স ও L.L.M পাশ করা ঘরের ছেলে দায়িত্ব নেওয়ায় ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব হবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টোটি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভূক্তভোগীরা বলছেন, বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার জাহিদুল হকের ন্যায় এ পর্যন্ত যতো সাব রেজিস্ট্রার এসেছে সকলেই “গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে” অবৈধ টাকার নেশায় এই সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে “ঘুষ দুর্নীতিকে বেগবান করেছেন”। তাই “পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক সাব-রেজিস্ট্রার নয়, মূল স্টিয়ারিং রয়েছে জসিম ও রাজিবের হাতেই।
উমেদার জসিমের জীবনের শুরুটা ছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। গার্মেন্টসে কাজ করতেন, সংসার চলত টানাপোড়েনে। ” নুন আনতে পান্তা ফুরাতো”। পরে এক আত্মীয়ের সহায়তায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে “ঘুষ দিয়ে ঝাড়ুদারের কাজ পান”। চুক্তি মোতাবেক প্রতিদিন মাত্র ৬০ টাকা হাজিরা ছিল তার আয়, এখনো। কিন্তু আজকের দিনে সেই জসিম রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি, জমিজমা ও দেশে-বিদেশে একাধিক ব্যবসার মালিক।
এলাকাবাসী ও অফিসকর্মীদের অভিযোগ– সাধারণ চাকরিজীবী থেকে “প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নেতা”য় রূপান্তরিত হওয়ার পেছনে রয়েছে দলিল বাণিজ্য, জাল জালিয়াতি ও ঘুষের কাঁচা টাকার বান্ডিল। সিন্ডিকেট নেতা হয়ে শুধু পল্লবীতেই নয়, ধানমন্ডি, গুলশান, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও সদর, খিলগাঁওসহ সকল অফিসেই গোপন চুক্তিতে দলিল সম্পাদনের ইজারা হাতে নেন তিনি।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জসিমের রয়েছে—
মিরপুর শাহ আলীবাগ ৩৭/এ নম্বর বাড়িতে তিনটি ফ্ল্যাট।
মিরপুর গার্ডেনে শাশুড়ির নামে এক কোটি টাকার ফ্ল্যাট।
সাভার মসূরীখোলা এলাকায় ১৮-২০ শতাংশ জমি।
ময়মনসিংহ ভালুকায় বিশাল গরুর খামার।
সৌদি আরবে যৌথ ব্যবসায় লগ্নী কোটি কোটি টাকা।
দামি হাইয়েস মাইক্রোবাস ও নোয়া গাড়ি কিনেছেন (ভাই গিয়াস উদ্দিনের নামে)।
নিজ গ্রাম (শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ) একাধিক জমি ও পাকা বাড়ি।
এলাকাবাসীর মতে, এসব সম্পদের বাজারমূল্য অনেক আগেই কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অথচ জসিমের অফিসিয়াল আয় শুরু থেকে এখনও সেই দৈনিক মাত্র “” ৬০ টাকা””।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাংবাদিকরা জসিমের কাছে তথ্য চাইতে গেলে নিজেকে পরিচয় দিতেন টুঙ্গীপাড়ার বাসিন্দা বলে। দেখাতেন আওয়ামী লীগের প্রভাব। ২০২৪ সালে এক সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহের জন্য তার কাছে গেলে তাকে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন “আমার বাড়ি টুঙ্গিপাড়া” আপনি আমার কিছুই করতে পারবেন না। পরবর্তীতে সেই সাংবাদিক তার বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় একটি জিডি করেন– নিজের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে।”
জসিমের কাছে কোন গণমাধ্যম কর্মী গেলেই তাঁকে জসিম বলেন “বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, বড়ো বড়ো প্রিন্ট মিডিয়া, অনলাইন প্রোটাল সহ শীর্ষ গণমাধ্যম ব্যক্তিরা আমার আত্মীয়স্বজন ভাই-ব্রাদার। তাই সব সংবাদমাধ্যম আমার সম্পর্কে জানে। তাদের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক। জসিম প্রায়ই সাংবাদিকদের উচ্চস্বরে বলেন,“” আপনারা নিউজ করে যদি কিছু ফালাইতে পারেন তাহলে ফালান””কোন সমস্যা নেই।
পল্লবী সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সবকিছু এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে উমেদার জসিম। সাব রেজিস্ট্রার লাখে কতো পাবে ?? সহকারী, নকলনবিশ, অফিস সহায়ক, দালাল, মাস্তান, পাতি নেতা কে কতো পাবে তা নির্ধারণ করেন জসিম নিজেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনসেবার নামে জসিম বহুবছর ধরে ভণ্ডামি করে আসছে বলে প্রতিবেশিদের অভিযোগ। তাঁর গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ, ঢাকাৈৈা‘দানবীর’ মনে করেন। কিন্তু সচেতন এলাকাবাসী বলেন, “এটা আসলে দুর্নীতির কালোটাকা সাদা করার জঘন্য অপকৌশল। মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই লোকদেখানো এই দান-খয়রাত।
জসিম ও রাজিব সিন্ডিকেট শুধু ঘুষ-দুর্নীতিই নয়, বরং দলিল জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সর্বশান্ত করে ফেলে।
তাদের বিরুদ্ধে মোটাদাগে অভিযোগ—দলিলের পাতা ছিঁড়ে ফেলা, এনআইডি পরিবর্তন, ভলিউম টেম্পারিং, দাগ ও খতিয়ান পরিবর্তন, জমির শ্রেণী বদল, A P ( এনিমি প্রোপার্টি), VP ( ভেস্ট প্রোপার্টি) ব্যক্তি মালিকানায় ও ডেভলপার কোম্পানির সাথে গোপন চুক্তিতে বেআইনিভাবে রেজিষ্ট্রেশন। এছাড়া সাধারণ দলিল দাতা-গ্রহীতাকে সেরেস্তা ও বড়ো স্যার ( DR) এর নাস্তা খরচের নামে ব্যাপক হয়রানি করে থাকেন। দলিল দেখতে এলেও বখশিশের নামে টাকা হাতিয়ে নেয়। এসব জুলুম প্রতি কর্মদিবসে অহরহ চলতে থাকলেও স্থানীয় মাস্তান, চিহ্নিত দালাল, কতিপয় মহুরার ও অফিস স্টাফদের সমন্বয়ে গঠিত এই শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পান না। এমনকি জেলা রেজিস্ট্রারের নিকট কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করলেও এদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে কেউ কখনো দেখেনি।
নিবন্ধন অধিদপ্তর থেকে তাদেরকে বদলি করা হলেও দুই চারদিন এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি করে আবার পূর্বের কর্মস্থল পল্লবীতে এসে ভিড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভূক্তভোগীরা বলছেন, বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার জাহিদুল হকের ন্যায় এ পর্যন্ত যতো সাব রেজিস্ট্রার এসেছে সকলেই “গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে” অবৈধ টাকার নেশায় এই সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে “ঘুষ দুর্নীতিকে বেগবান করেছে”। তাই “পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক সাব-রেজিস্ট্রার নয়, মূল স্টিয়ারিং রয়েছে জসিম ও রাজিবের হাতে।
পল্লবীর “ধ” ব্লকের একজন জমি মালিক বলেন—“একটা জমির দলিল করতে গিয়ে পাঁচবার অফিসে দৌড়াতে হয়েছে। প্রতিবার আলাদা আলাদা অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর টাকা না দিলেই শুরু হয় নাবাবিধ ভৌতিক সমস্যা উত্থাপন, “পদে পদে চলে জমির ময়নাতদন্ত”।
আরেক দলিল লেখক অভিযোগ করে বলেন- সাব রেজিস্ট্রার জাহিদ স্যার এ অফিসে “কাঠের পুতুল” জসিম- রাজিব গং এই অফিসের রাজা-বাদশা!!
“আমরা বাধ্য হয়ে টাকা দিই। উমেদাররা এখন অফিসের রাজা। তাদের বাদ দিয়ে কোনো কাজ করা যায়না।”
অপরাধ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনিক ৬০ টাকা হাজিরার উমেদারদের নামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ থাকাটা অপরাধ। দুর্নীতি দমন কমিশন চাইলে খুব সহজেই সাব রেজিস্ট্রার সহ “প্রত্যেকের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান “ করতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত জেলা রেজিস্ট্রার ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, “এসব উমেদার, সহকারী, নকলনবিশ, অফিস সহায়করা আসলে পুরো সাব-রেজিস্ট্রি জগতের দুর্নীতির জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতম আইনী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”

ভূক্তভোগীদের দাবি, সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন যেন অবিলম্বে উমেদার জসিম ও রাজিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ পূর্বক এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়। তা না হলে এই অফিসের দুর্নীতির “”দগদগে ক্ষত একসময় মারাত্মক ক্যান্সারে পরিণত হবে””।






















You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :