
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, ঢাকা:
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৪ (পূর্বাঞ্চল) অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্যের এক অঘোষিত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে৷
এই ঘুষ দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্যের মহানায়ক ছাত্রলীগের সাবেক দুই পেতাত্মা উপপরিচালক (DD) গোপালী রফিকুল ইসলাম ও “সর্বঘটে কাঁঠালিকলা” উচ্চমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হারুন অর রশিদ হারুন।
তাঁর দাপট ও ক্ষমতার বলয়ে তাঁর সিনিয়র কর্মকর্তা থেকে প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদেরও তিনি রাখতেন বদলি ও ওএসডি আতঙ্কে।। সে সময় বদলি পদন্নোতি ও বদলি আদেশ বাতিলের মহান রূপকার ছিলেন তিনি। কাকে কোন সার্কেলে পাঠাতে হবে, কাকে শাস্তিমূলক বদলি করে নিভৃত মফস্বলে বা দুর্গম এলাকায় পাঠাতে হবে, কাকে পদন্নোতি দিয়ে জাতে উঠাতে হবে তা তিনি তাঁর মিরপুরের শীততাপ কক্ষে বসে মোবাইলে নিয়ন্ত্রণ করতেন। আর এসব খাত থেকে তিনি গড়ে তুলেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
“ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লব চলাকালীন সময়ে রফিকুল ইসলাম শীর্ষ নেতাদের নির্দেশে গভীর রাতে পরপর তিন দফায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের সাথে গোপন শলাপরামর্শে লিপ্ত হন এবং ছাত্র জনতার আন্দোলন বানচাল করতে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা লগ্নী করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে”।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট দেশের পট পরিবর্তনের সময় আওয়ামী পেতাত্মারা সকলে যখন কোনঠাসা তখন রফিকুল ইসলাম দিন পনেরো গা ঢাকা দিয়ে থেকে পরে কতিপয় বিএনপি নেতাকে ম্যানেজ করে আবারো স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেন।
বিআরটিএর ভিতরে তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীরা যখন সকলে ধরেই নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা সরকারের পতন মানেই লীগের পেতাত্মা রফিকুল ইসলাম বড়সড় রকমের ধাক্কা খাবেন— কার্যত তা হয়নি।
ঘুষ দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্যের মাস্টার মাইন্ড বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৪ (পূর্বাঞ্চল) অফিসে বদলি হয়ে এসেই সকল দুনম্বরি কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিজ পকেটে পুরে নেন।
রেজিষ্ট্রেশন,ড্রাইভিং লাইসেন্স, মালিকানা বদল, ফিটনেস, রোড পারমিট, চোরাই যানবাহনের জাল কাগজপত্র প্রস্তুত সহ সকল দুনম্বরি কাজের অবৈধ টাকা কালেকশনের ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব অর্পণ করেন “সর্বঘটে কাঁঠালিকলা” উচ্চমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হারুন অর রশিদ হারুন এর হাতে।।
“এম্নিতেই নাচুনি বুড়ি, তার ওপর ঢোলে বাড়ি” ফলে আগাগোড়া দুর্নীতির বরপুত্র হারুন ক্ষমতা হাতে পেয়ে এবার তার গোপন দালাল সিন্ডিকেটের সদস্যদের প্রকাশ্যে গ্রাহক হয়রানি ও লুটপাটের ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে নরকে পরিণত করেন বিআরটিএ মেট্রো সার্কেল- ৪ ( পূর্বাঞ্চল) কার্যলয়কে। এভাবে প্রতি কর্মদিবসে হারুন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ টাকা সহকারী পরিচালক ছাত্রলীগের সাবেক পেতাত্মা রফিকুল ইসলামের টেবিলে যথাসময়ে পৌঁছে যাওয়ার কারণে তিনিও রয়েছেন খোশমেজাজে।।

অভিযোগকারীদের দাবি, উপপরিচালকের প্রশ্রয়ে হারুন দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন যানবাহন সক্রান্ত সেবা প্রদানের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করছেন প্রকাশ্যে। এই অর্থের একটি বড় অংশ উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলামের থলিতে জমা পড়ার পর বাকি টাকা দু’জন সহকারী পরিচালক ও তিনজন মোটরযান পরিদর্শক কে কমবেশি দিয়ে বাকি সমুদয় টাকা স্থানীয় নেতা, মিডিয়া ও হেড অফিস ম্যানেজের নামে পুরোটাই আত্মসাৎ করছেন কথিত ক্যাশিয়ার ও রফিকুল ইসলামের প্রাণ ভোমরা হারুন অর রশিদ হারুন।।
ভূক্তভোগী গ্রাহকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিআরটিএর এই অফিসে গিয়ে সরাসরি সরকারি নিয়মে কাজ করাতে চাইলে নানা ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হয়। কখনো বলা হয় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, কখনো আবার নতুন কোনো নিয়ম বা মনগড়া শর্তের কথা বলে আবেদনকারীকে কয়েকদিন পর আবার আসতে বলা হয়। কিন্তু একই কাজ অফিসের গেটের বাইরে অবস্থান করা হারুন সিন্ডিকেটের দালালদের মাধ্যমে করলে “টাকা অনেক বেশি খরচ হলেও” খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা সম্পন্ন হয়ে যায়। এ কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালদের শরণাপন্ন হন।
অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হারুন ইসলামের মুখে সবসময় একটি রহস্যময় হাসি লেগে থাকে। অনেকেই বলেন, তার আচরণ খুব শান্ত ও স্বাভাবিক হলেও কাজের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী। অফিসের ভেতরে তার কথার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
হারুন অর রশিদ হারুন চাকরির শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে আপাদমস্তক নিমজ্জিত। ইতোমধ্যে হারুন উচ্চমান সহকারী হলেও অবৈধ টাকায় গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। করেন বিলাসবহুল জীবনযাপন।

অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে হারুন রাজধানীর সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
সেনপাড়া পর্বতা এলাকার ৪২৯/এ নম্বর ভবনে প্রায় দুই হাজার বর্গফুট আয়তনের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে। বর্তমানে তিনি সেখানেই বসবাস করছেন বলে জানা যায়। চড়েন দামি গাড়ি।
হারুন ইসলামের অতীত কর্মস্থল নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, তিনি একসময় মিরপুর-১৩ নম্বর বিআরটিএ কার্যালয়ের ১১৪ নম্বর কক্ষে দায়িত্ব পালন করতেন। সেই সময়ও দালালের মাধ্যমে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর তাকে সিলেট মেট্রো সার্কেলে বদলি করা হয়।
তবে সিলেটে বদলি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, এই ফিরে আসার পেছনে গোপনসিঁড়িতে মোটা অংকের অর্থ লেনদেন হয়েছিল।

সিলেটে কর্মরত থাকাকালীন সময়েও তার জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একজন উচ্চমান সহকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত বিমানে যাতায়াত করতেন বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মতে, একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে এত ব্যয়বহুল জীবনযাপন করা স্বাভাবিক নয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে তখনও বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়।
অফিসের ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন উচ্চমান সহকারীর পক্ষে এত সম্পদের মালিক হওয়া অস্বাভাবিক। তারা মনে করেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
সচেতন মহলের মতে, সরকারি সেবা খাতে এ ধরনের অনিয়ম শুধু জনগণের ভোগান্তিই বাড়ায় না, বরং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। তাই এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা জরুরি।
এ বিষয়ে উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম ও হারুন অর রশিদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোন রিসিভ না করাই তাঁদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ( চলবে)
আপনার মতামত লিখুন :