

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সারাবিশ্ব প্রতিনিয়ত গ্রীনহাউজ ইফেক্ট ও কার্বন নি:সরণের ক্ষতিকর প্রভাবে ক্রমশ: মৃত্যূর মুখে ধাবিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মান, রাশিয়া, চীন সহ বিশ্বের বাঘা বাঘা রাষ্ট্রগুলো যখন জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করছে, তখন নিজ উদ্যোগে কারো কোনো সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন প্রচারবিমুখ এক পরিবেশবিদ পার্বত্য অঞ্চলের সন্তান লাখো তরুণ তরুণী ও শিক্ষার্থীদের আইডল “সবুজ চাকমা”।
পেশায় তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে তিনি রাঙামাটি সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী।
একান্ত কথোপকথনে সবুজ চাকমা দৈনিক দেশবাংলা ও আজকের পেপারকে বলেন, গ্রীনহাউজ ইফেক্ট এবং কার্বন নিঃসরণ হলো পৃথিবীর জলবায়ু ও পরিবেশের সাথে জড়িত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে অবহিত করা আবশ্যিক।
গ্রীনহাউজ ইফেক্ট হলো একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা কিছু গ্যাস সূর্যের তাপ আটকে রেখে ভূপৃষ্ঠকে উষ্ণ রাখে। শীতপ্রধান দেশে কাঁচের ঘর বানিয়ে যেভাবে ভেতরটা গরম রাখা হয় (যাকে গ্রীনহাউজ বলে), আমাদের বায়ুমণ্ডলও ঠিক তেমনি একটি কম্বলের বা কাঁচের ঘরের মতো কাজ করে।
এই স্বাভাবিক প্রভাব না থাকলে পৃথিবী প্রচণ্ড ঠান্ডা (-১৮° সেলসিয়াসের মতো) হতো এবং এখানে কোনো জীব বা মানুষের বসবাস সম্ভব হতো না।
মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বায়ুমণ্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তাপ আটকে রাখার ক্ষমতা অতিরিক্ত বেড়ে গেছে, একে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলে।
★কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)
★মিথেন (CH₄)
★জলীয় বাষ্প
★নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O)
★ওজোন (O₃) এবং ফ্লোরিনযুক্ত গ্যাস।
নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা আরও বলেন,
২. কার্বন নিঃসরণ (Carbon Emission)
কার্বন নিঃসরণ বলতে মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি ও অন্যান্য উৎস থেকে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) এবং অন্যান্য কার্বন-যুক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়া বোঝায়।
যেমন,
★কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো।
★কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া।
★নির্বিচারে বন উজাড় (গাছ কেটে ফেলা), যা বাতাস থেকে কার্বন শুষে নিতে বাধা দেয়।
★আধুনিক শিল্প উৎপাদন ও কৃষিকাজ।
আর কার্বন ডাই-অক্সাইড হলো প্রধান গ্রীনহাউজ গ্যাস। তাই কার্বন নিঃসরণ যত বাড়বে, গ্রীনহাউজ ইফেক্ট তত তীব্র হবে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে। এসব কারণে পৃথিবীকে দীর্ঘদিন সুস্থ ও সাবলীলভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও সবুজ বনায়নের কোনো বিকল্প নেই।
এ সময় তিনি আরও বলেন, শুধু নিজে ভালো থাকাটাই যথেষ্ট নয়। আশে-পাশের তথা দেশের সকল মানুষকে ভালো রাখাটাও সচেতন মানুষের একান্ত দায়িত্ব। তাই কে বাহবা দিবে বা কে পুরস্কৃত করবে এসব মাথায় না রেখেই আমৃত্যু আমি জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও সবুজ বনায়নে নিরলস পরিশ্রম করে যেতে চাই।
ইতোমধ্যে এই নিভৃতচারী প্রকৌশলী প্রতিনিয়ত নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন অনন্য উচ্চতায়।।
পেশাগত জীবনেও তিনি একজন সদালাপী ও নির্লোভ প্রকৃতির খাঁটি মানুষ। অধিকাংশ সরকারি দপ্তরে যেখানে অফিস সহায়ক থেকে কেরানী পর্যন্ত অবৈধ টাকা হাতানোর নেশায় মত্ত, সেখানে সবুজ চাকমার মতো প্রথমশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের এই ব্যতিক্রমী মন-মানসিকতা সত্যিকার সোনার বাংলা গড়ার পথে মনস্তাত্ত্বিক আত্মতৃপ্তির পাথেয় যোগায়।
পরিবেশ সুরক্ষা, পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি হ্রাস এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ রাঙ্গামাটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর পাশে বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
বর্তমান বিএনপি সরকারের ঘোষিত ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা নেতৃত্বাধীন রাঙ্গামাটি সড়ক বিভাগ এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছে। এ কর্মসূচীর আওতায় আগামী পাঁচ বছরে মোট ৪১ হাজার গাছের চারা রোপণ করবে রাঙামাটি সওজ।
বুধবার (১লা এপ্রিল) ২০২৬ দুপুরে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের সাপছড়ি যৌথ খামার এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।।

চলতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস ও সড়ক ভাঙনের ঝুঁকি এড়াতে রাঙ্গামাটি শহর ও উপজেলার আন্তঃসড়কগুলোতে আগাম সংস্কারকাজ শুরু করে রাঙ্গামাটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। ওইসময় শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ভবনের সামনে ভরা বর্ষা মৌসুমে ধসে যাওয়া প্রধান সড়কটির মেরামত ও সুরক্ষামূলক কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেন। পাইপ পাইলিংয়ের মাধ্যমে বালি ও সিমেন্টের মিশ্রণে বস্তা ব্যবহার করে প্রটেকশন ব্লক নির্মাণ করে তাৎক্ষণিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হয়। সওজের এই সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে পাহাড়ি এই শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেও রেহাই পান স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা। পর্যাপ্ত বাজেট না থাকা সত্ত্বেও এই মহতী উদ্যোগে সর্ব মহলে প্রশংসিত হন নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা।
রাঙামাটি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা ইতোমধ্যে পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষায় অবদান রাখায় ‘ব্রাক ব্যাংক–তরুপল্লব দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক ২০২৪ ও বৃক্ষসখা সম্মাননা’ পেয়েছেন।

৩০ শে আগস্ট,শনিবার ২০২৫ ঢাকায় বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে পদক ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে সবুজ চাকমার হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
প্রকৌশলী সবুজ চাকমা রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার চাকমা রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী একজন কৃতী সন্তান। পেশাগত কাজের বাইরেও তিনি একজন শৌখিন আলোকচিত্রী ও প্রকৃতি-পরিবেশপ্রেমী হিসেবে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য অসাধারণ উচ্চতায়।
সবুজ চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ-প্রকৃতিবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি’র অন্যতম শীর্ষ সংগঠক ও প্ল্যানটেশন ফর নেচারের প্রতিষ্ঠাতা সবুজ চাকমা। এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের বন্যপ্রাণীর ছবি সংগ্রহ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।।
প্রকৃতি রক্ষার নিজের দায়বদ্ধতা থেকে গড়ে তুলেছেন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্লানটেশন ফর নেচার। এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত তিনি ৮৭ হাজার ৫৬০ টি পাখি বান্ধব চারা বিতরণ এবং রোপণ করেছেন।
এছাড়া খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগে কর্মরত অবস্থায় সড়কের দুপাশে প্রায় চার হাজার পাখিবান্ধব জ্যাকারান্ডা গাছের চারা রোপণ করেন। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় রাঙামাটিতেও সওজ লেক ভিউ গার্ডেনের উদ্যোগ নেন সবুজ চাকমা।
এর আগে ২০২৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগ আয়োজিত বাটারফ্লাই অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন সবুজ চাকমা।

বরেণ্য দেশপ্রেমী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা গোটা পার্বত্য অঞ্চলসহ “” সবার আগে বাংলাদেশ” প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এঁর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে সুদৃঢ় পদক্ষেপ ও যথাযথ ভূমিকার প্রতিফলন ঘটাবেন এটিই প্রত্যাশা।।।
আপনার মতামত লিখুন :