
সজীব আকবর,অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও ভূয়া শিক্ষা সনদে মধ্য বয়সে সাব রেজিস্ট্রার এর পদ বাগিয়ে নেওয়া ভূয়া সাব রেজিস্ট্রার কাজী নজরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা তথা মুজিবনগর সরকারের কথিত কর্মচারী পরিচয়ে আরও ১ বছর তাঁর কর্মকাল বৃদ্ধি করেছেন কৌশলে। বর্তমানে নজরুল পটুয়াখালীর খেপুপাড়া সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত। অনেকের মতো এই সাব রেজিস্ট্রারকে ঘিরে ব্যাপক অভিযোগ থাকায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চাকরির মেয়াদ বর্ধিত করাটা ছিলো প্রায় অসম্ভব। তাই তিনি গোপনসিঁড়ি ব্যবহার করে এক বছরের জন্য আবারো চাকরি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ লুফে নিয়েছেন।
১৯৬৭ সালের ২রা এপ্রিল জন্মগ্রহণকারী কাজী নজরুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় বয়স ছিলো ৪ বছর ১ মাস। আর ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে তাঁর বয়স দাঁড়ায় ৪ বছর ১০ মাস। তারপরও তিনি দুর্নীতিবাজ আওয়ামী নেতাদের ম্যানেজ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকে মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে হাতিয়ে নেন মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীর সনদ। ৫ বছরের কম বয়সে তিনি কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হলেন তা জেনে তাঁর প্রতিবেশীরাও বিস্মিত ও বাকরুদ্ধ। আপাদমস্তক দুর্নীততে নিমজ্জিত এই ভূয়া সাব রেজিস্ট্রার কাজী নজরুল ইসলাম নামে বেনামে গড়েছেন শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়।।
২০২৬ সালের ১লা এপ্রিল তাঁর কর্মকাল শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে যুগ্ম সচিব( রেজিস্ট্রেশন) হাসান মাহমুদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ১১/৫/২০২৬ ইং তারিখে এক প্রজ্ঞাপনে ১ বছর চাকরি বর্ধিত করা হয়৷ সে হিসেবে বিতর্কিত ও ভূয়া সাব রেজিস্ট্রার কাজী নজরুল ইসলাম অবসরকালীন ছুটিতে যাবেন ২০২৭ সালের ১লা এপ্রিল।
মুজিবনগর সরকারের কথিত কর্মচারী হিসেবে মধ্য বয়সে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি পাওয়ার পর বেশিরভাগ কর্মকর্তাই রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার লক্ষ্যে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন বলে নিবন্ধন অধিদফতরের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন। তাঁরা বলেন, অনেকের তেমন কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার পরও ভুয়া শিক্ষাগত সনদ দেখিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার হয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এবং বেশি বয়সে যোগদান করায় তাঁদের চাকরি যেহেতু অল্প কয়েক বছরের জন্য তাই তাঁরা এই অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচুর অর্থ সম্পদ বানিয়ে নিয়েছেন। অনেকেই টাকার বিনিময়ে ব্যক্তি নামে খাস জমি নিবন্ধন, শ্রেণি পরিবর্তন করে ও ভুয়া খাজনা খারিজ নিয়ে জমি নিবন্ধন করে দিয়েছেন।
মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীর ভূয়া পরিচয়ে চাকরি নেওয়া এবং দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগে ২০১২ সালে ৩৯ জনকে বরখাস্ত করেছিল মন্ত্রণালয়। তবে উচ্চ আদালতে গিয়ে তাদের অনেকেই আবার চাকরি ফিরে পান। দুর্নীতি ও জালিয়াতির দায়ে বরখাস্ত হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে চাকরি ফিরে পাওয়াদের মধ্যে অন্যতম প্রধান সাব-রেজিস্ট্রার কাজী নজরুল ইসলাম, রামজীবন কুণ্ডু, ওসমান গণি, লুৎফর রহমান, খন্দকার গোলাম কবির,অসীম কল্লোল, মঞ্জুরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আবুল হোসেন, বোরহান উদ্দিন,মিনতী দাস, মিনতী দাসের স্বামী পরিতোষ দাস, মোংলার স্বপন কুমার দে, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, বর্তমানে জেলা রেজিস্ট্রার মো: আলী আকবর(মেহেরপুর) ও শফিকুল ইসলাম ( ফরিদপুর) প্রমূখ।।

মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে আওয়ামী শাসনামলে কর্মস্থলে তাঁদের ব্যাপক আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। প্রভাবশালী এসব কর্মকর্তা পদায়ন বাগিয়েছেন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে।
২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের ভিত্তিতে ১৯০ জন মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীকে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগের লক্ষ্যে একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে এই ১৯০ কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ৩০ জনকে প্রকৃত মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে তৎকালীন আইন সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বে এই যাচাই-বাছাই কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রায় সবাইকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁরা সবাই সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের উদ্যোগে। নিয়োগের তালিকা অনুযায়ী ১৯৬৭, ১৯৬৬, ১৯৬৫ সালে জন্মতারিখ আছে এমন সংখ্যা ছিল অনেক। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধকালে তাদের বয়স ছিল ৪ থেকে ৬ বছর। জালিয়াতির মাধ্যমে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া নিয়ে তখন নিবন্ধন অধিদপ্তরসহ আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
পুনশ্চ: ভূয়া সাব রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রার সকলেই হাজারো অভিযোগের পাহাড় ঠেলে একে একে সকলেই পিআরএলে চলে গেলেও কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। অনেকেই চাকরির মেয়াদ না বাড়িয়ে মানে মানে কেটে পড়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম ও সদ্য বিদায়ী ওসমান গণি মন্ডলরা কি অধরাই থেকে যাবে, এ প্রশ্ন এখন সর্বত্র।।
আপনার মতামত লিখুন :