কৃষিজমি কমছে, বাড়ছে ট্রাক্টর বিক্রি: কিস্তির ফাঁদে নিঃস্ব কৃষক, ট্রলি বাণিজ্যে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : জুন ৬, ২০২৬, ৭:৪৮ PM / ০
কৃষিজমি কমছে, বাড়ছে ট্রাক্টর বিক্রি: কিস্তির ফাঁদে নিঃস্ব কৃষক, ট্রলি বাণিজ্যে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

২০ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ট্রাক্টর-পাওয়ার টিলার বিক্রি, তিন কিস্তি বকেয়া হলেই জব্দ; লাখ লাখ টাকা হারিয়ে দেউলিয়া হচ্ছেন কৃষকরা — কৃষিযন্ত্র দিয়ে চলছে অবাধ পণ্য পরিবহন, বাড়ছে দুর্ঘটনা ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

আহসান হাবিব মিলন,রংপুর ব্যূরো:

রংপুর অঞ্চলে কৃষিকাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারকে ঘিরে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিস্তিতে কৃষিযন্ত্র বিক্রির নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কথিত চুক্তির ফাঁদে পড়ে শত শত কৃষক আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কৃষি কাজের জন্য কর ও শুল্ক সুবিধায় আমদানি করা এসব যন্ত্র ব্যবহার করে ট্রলি সংযুক্ত করে বাণিজ্যিকভাবে পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আইন, নীতিমালা ও সরকারি সুবিধার অপব্যবহার নিয়ে।

কৃষিজমি কমছে, অথচ বাড়ছে ট্রাক্টর বিক্রি

কৃষি বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, দেশে প্রতিবছর কৃষিজমির পরিমাণ কমলেও ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের বিক্রি কেন ক্রমাগত বাড়ছে? তাদের মতে, কৃষিকাজের চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সংখ্যক ট্রাক্টর বাজারজাত হওয়ার পেছনে একটি বড় অংশ বাণিজ্যিক ট্রলি ব্যবসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষি যান্ত্রিক পণ্য প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রংপুর অঞ্চলে বছরে সবচেয়ে বেশি ট্রাক্টর বিক্রি করে এসিআই। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিক্রি ৫ হাজারের বেশি বলে দাবি করা হয়। এছাড়া এসকিউ গ্রুপের কৃষি যন্ত্র বিভাগ বছরে রংপুর অঞ্চলে কয়েকশ ট্রাক্টর বিক্রি করে। দেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে এসিআই মোটরস লিমিটেড ও দ্য মেটাল লিমিটেড শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাক্টর ও কৃষি যন্ত্রপাতি বাজারজাত করছে।

২০ শতাংশ টাকা ডাউন পেমেন্ট, তারপর ৪৮ কিস্তির ফাঁদ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন কোম্পানি কৃষকদের ২০ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার সরবরাহ করে। বাকি অর্থ চার বছরে ৪৮টি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের শর্ত থাকে।

চুক্তি অনুযায়ী, টানা তিনটি কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না হলে কোম্পানি বা ডিলার কর্তৃপক্ষ গাড়ি জব্দ করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায়। আরো অভিযোগ রয়েছে, কিস্তি বিক্রয়ের সময় সহজ শর্তের কথা বলা হলেও চুক্তির জটিল ধারা ও ঝুঁকির বিষয়গুলো অধিকাংশ কৃষককে স্পষ্টভাবে জানানো হয় না।

গাড়ি জব্দের পর খুলে নেওয়া হয় যন্ত্রাংশ!

একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, গাড়ি জব্দ করার পর প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ট্রলারের টায়ার, পাম্প, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে অন্য গাড়িতে ব্যবহার বা বিক্রি করে দেন। পরে এসব যন্ত্রাংশের দায়ও গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

কৃষকদের দাবি, গাড়ি জব্দের পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে নেওয়া আগাম ফাঁকা ব্যাংক চেকও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। ফলে একদিকে গাড়ি হারাতে হয়, অন্যদিকে ইতোমধ্যে পরিশোধ করা বিপুল অর্থও আর ফেরত পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে একজন কৃষককে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, “গাড়ি, টাকা ও ব্যাংক চেক—সবকিছু হারিয়ে আমরা কার্যত দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছি। আইনি লড়াই করার সামর্থ্যও থাকছে না।”

কৃষিযন্ত্র দিয়ে চলছে ট্রলি ব্যবসা

স্থানীয় সূত্র জানায়, কৃষিকাজের জন্য কেনা ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের সঙ্গে ট্রলি সংযুক্ত করে ইট, বালু, পাথর, ধান, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পরোক্ষ উৎসাহেই এসব যান ট্রলি ব্যবসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি খাতের জন্য দেওয়া কর ও শুল্ক সুবিধা নিয়ে যদি এসব যান নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিবহনে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি প্রকৃত কৃষকরাও বঞ্চিত হচ্ছেন।

সড়ক নিরাপত্তা ও বৈধ পরিবহন খাতে নেতিবাচক প্রভাব

ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, কৃষিযন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত এসব অবৈধ ট্রলি সড়কে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে। ফলে একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে বৈধ মালবাহী পরিবহন খাত আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তাদের দাবি, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, ইটভাটার পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন মালামাল বহনে এসব ট্রলি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারী বোঝা বহনের কারণে অনেক সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সরকারের বিপুল রাজস্বও হারিয়ে যাচ্ছে।

তদন্ত ও সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি

সুশীল সমাজ, কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, কিস্তিভিত্তিক ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার বিক্রির চুক্তি, গাড়ি জব্দের বৈধতা, গ্রাহকের পরিশোধকৃত অর্থের হিসাব এবং কৃষিযন্ত্র দিয়ে বাণিজ্যিক পরিবহনের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করতে হবে।

তারা কৃষি মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের সুবিধার অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।