দামুড়হুদা জগন্নাথপুরের সন্তান D.R শফিকুল ইসলাম গড়েছেন শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১, ২০২৬, ৫:৫৯ PM / ০
দামুড়হুদা জগন্নাথপুরের সন্তান D.R শফিকুল ইসলাম গড়েছেন শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুর নিবাসী করিৎকর্মা অফিসার ফরিদপুর জেলার বহুল আলোচিত  মুজিবনগর সরকারের কথিত কর্মচারী ভূয়া জেলা রেজিস্ট্রার ( D.R) শফিকুল ইসলাম। প্রথম দর্শনে তাঁকে দেখতে নায়কোচিত পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব মনে হলেও তাঁর ঘুষ দুর্নীতি ও জাল দলিল বাণিজ্যের শিকড় রয়েছে অনেক গভীরে। ফরিদপুরে যোগদানের শুরু থেকেই তিনি লুটপাট বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আবির্ভূত।। তিনি ফরিদপুরে প্রতিমাসে বেতনের বাইরে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা। জেলা সদরসহ এখানে মোট সাব রেজিস্ট্রি অফিস আছে ৯ টি। সেগুলো হচ্ছে, ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, মধুখালী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, নগরকান্দা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ভাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, চরভদ্রাসন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বোয়ালমারী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সদরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সালথা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও আলফাডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ।

প্রতিমাসে এই ৯টি সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিল সম্পাদন হয় ১০/১১ হাজার। তিনি তাঁর সহকারীর মাধ্যমে মাস শেষে দলিল প্রতি হাতিয়ে নিচ্ছেন ১ হাজার টাকা হিসেবে নাস্তা খরচের নামে কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও শেখ হাসিনার পেতাত্মা শফিকুল ইসলাম মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সাব রেজিস্ট্রার থাকাকালীন দূর্নীতির হাতেখড়ি হয়। এরপর পার্শ্ববর্তী এলকার তৎকালীন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কে দিয়ে মোটা অংকের দক্ষিণার বিনিময়ে তদবির করিয়ে ২০২১ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। আর তখন থেকেই দুর্নীতির মাধ্যমে নামে বেনামে গড়ে তোলা শুরু করেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

D.R শফিকুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য সম্পদ হচ্ছে

কল্যাণপুর ঢাকা বাসা নম্বর -১২. রোড নং -০২.ওয়ার্ড নং -১১.. ড্রিম হেভেন ভবনে বিলাস বহুল ফ্লাট রয়েছে।

তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া ইসলাম এর নামে একটি অত্যাধুনিক গাড়ি রয়েছে। যার গাড়ি নং – ঢাকা মেট্রো -গ- ২৫-৬১৬৬.

তাঁর দুই ছেলে মাহি ও মুহিত এর নামে অবৈধ সম্পদের বিষয় অনুসন্ধান চলমান।

নিজ জেলা চুয়াডাঙ্গা সদরে কাঠপট্টি( রূপছায়া সিনেমা হল) এলাকায় চার তলা আলিশান বাড়ি এবং

কার্পাসডাঙ্গা বাজারে মার্কেটসহ আরও একটি চার তলা ভবন।

আট কবর এলাকা: এখানে রয়েছে মার্কেটসহ দুই তলা ভবন। এছাড়া জগন্নাথপুর নিজ গ্রামেও রয়েছে বিলাসবহুল দুই তলা বাড়ি।

রাজধানী ও অন্যান্য জেলা: ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি ছাড়াও যশোর ও ঝিনাইদহে তার একাধিক বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে।

বেনামি সম্পদ: মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস গ্রামে ভাইয়ের নামে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন তিনি।

ব্যবসা ও বিলাসিতা: ভাগিনা মোঃ হুমায়ুন আহমেদের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন কোটি টাকার ‘নেহা ত্বহা ট্রেডার্স’। এছাড়া নিজের চলাচলের জন্য ব্যবহার করেন বিলাসবহুল প্রাইভেট কার।

এছাড়াও তিনি সংগোপনে ব্যবহার করেন একাধিক বেনামী ব্যাংক একাউন্ট।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ই আগষ্ট ২০২৪ জুলাই আন্দোলনের মুখ শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে শফিকুল ইসলাম আইজিআর অফিসের অনুমতি ছাড়াই আত্মগোপন করেন।। সে সময় দীর্ঘদিন যাবৎ অনুপস্থিত থাকার কারণে ব্যাপক ক্ষোভে ফেটে পরে ভূক্তভোগী ও সচেতন মহল।

এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ২৪ সালের ১০ই অক্টোবর ফরিদপুর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। তারপর থেকে তাঁরই ছত্রছায়ায় ফরিদপুর সদর সাব রেজিস্ট্রার সহ জেলার অন্যান্য সাব রেজিস্ট্রারগণ ঘুষ দূর্নীতির অপ্রতিরোধ্য প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। যা ছাত্র জনতার হাতে ধরাও খায় এবং দুদকেও মামলা দায়ের হয় সাব রেজিস্ট্রার দের নামে, কিন্তু এই সমস্ত দূর্নীতির মাস্টারমাইন্ড সুচতুর শফিকুল পর্দার আড়ালে থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এর আগে শেখ হাসিনার পেতাত্মা শফিকুল ইসলাম ” জুলাই বিপ্লব দমন”” করার মানসে কতিপয় অস্ত্রধারী যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সাথে রাতের আঁধারে গভীর চক্রান্ত ও শলাপরামর্শে লিপ্ত হন। তাছাড়াও ছাত্র জনতার ওই আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য বিশেষ মহলের ফোন পেয়ে মোটা অংকের টাকা লগ্নী করেন।

ওই সময় নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলে দুর্নীতির বিষয়ে ভুক্তভোগীরা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুস্পষ্ট অভিযোগ দাখিল করেছেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণও সরবরাহ করেছেন। তবে, অত্যন্ত হতাশাজনক বিষয় হলো, অভিযোগ দাখিলের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দুদক দৃশ্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

অভিযোগ করা হয়, জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
দলিল প্রতি ১ হাজার টাকা হিসেবে প্রতি মাসে কোটি টাকা কালেকশন ছাড়াও প্রতি ৩ মাস পরপর উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে “”অফিস ভিজিট “”এর নামে হাতিয়ে নেন ৩ লাখ টাকা করে।

বছরে এই ৯ টি অফিসে তিনি ৩৬ বার ভিজিট করে হাতিয়ে নেন ৩৬ × ৩ লাখ =১ কোটি ৮ লাখ টাকা।

এছাড়া দলিল লেখক ও নিকাহ রেজিস্ট্রারদের লাইসেন্স নবায়নের নামেও করেন কোটি টাকার বাণিজ্য। নকল উত্তোলন থেকে আসে প্রায় দেড় কোটি টাকা। এছাড়া স্টাফদের পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যতেও তিনি হাস্যোজ্জ্বল বদনে পকেটস্থ করেন লাখ লাখ টাকা। এছাড়া জমি জাল জালিয়াতি, গ্রাহকদের এনআইডি পরিবর্তন, সাব রেজিস্ট্রারদের মাধ্যমে জমির শ্রেণী পরিবর্তন দেখিয়ে ফ্রেশ ভিটা জমিকে ডোবাবালা ও পতিত দেখিয়ে সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত করে সেসব টাকার বৃহৎ অংশ তিনি তুলে নেন আপন ঝুলিতে।

এর পাশাপাশি AP/VP সাব রেজিস্ট্রারদের দিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় ও ডেভলপার কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে তিনি কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা

দুদকের ভূমিকা ও ‘ম্যানেজ’ করার গুঞ্জন:

সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগটি হলো দুদকের কার্যক্রম নিয়ে। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণাদীসহ অভিযোগ দাখিল করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, তদন্ত প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে দুদকের একটি প্রভাবশালী অংশ ও কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীকে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করেছেন শফিকুল ইসলাম। ফলে আটকে আছে তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির ফাইল।

D.R শফিকুল ইসলামের খুুঁটির জোর কোথায়?

একটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও অতীতে এতসব গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে সরকারি মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা এবং সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই ‘দুর্নীতিবাজ’ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভূক্তভোগী ও দলিল লেখক সমিতির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার অফিস শেষে তার সহকারী ও তাকে তল্লাশী করলে ” দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম” অবৈধ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করতে পারবে।