

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজের কষ্টের টাকায় কেনা জমি, নিজের গড়া বসতবাড়ি। অথচ সেই বাড়িতেই এখন রাত কাটাতে ভয় পান সামছুন নাহার। স্বামী প্রবাসী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে শাহীন দেশের বাইরে। দুই সন্তান আর শাশুড়িকে নিয়ে রংপুর মহানগরীর তাজহাটের আশরতপুরে একাই লড়ছেন তিনি।
গত কয়েক মাস ধরে প্রতিপক্ষ আকবর ও আকরাম গংয়ের হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ জানাতে গিয়ে বারবার থানার দরজায় ঘুরেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। বরং ওসির মুখে শুনতে হয়েছে, “আপনারা তো আসামির পক্ষের লোক।”
সামছুন নাহার জানান, তাজহাট মৌজার জে.এল নং ৯৭, দাগ নং ৬৯৬ এর ১৭.৫ শতক জমি স্বামীর প্রবাসের আয় দিয়ে কেনা। দলিল হয়েছে, খাজনা-খারিজ করে নামজারিও করা হয়েছে। জমিতে রয়েছে বসতবাড়ি, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ ও পুকুর। বিগত ১২-১৩ বছর ধরে সুনামের সাথে এখানেই সংসার ও ব্যবসা চালাচ্ছেন তারা।
কিন্তু প্রতিপক্ষ মোঃ আকবর ও মোঃ আকরাম, পিতা মৃত খলিল, সাং আলমনগর, ১৯৬২ সালের রেকর্ড মূলে মালিকানা দাবি করে আদালতে ৫০/২৫ নং মামলা চালাচ্ছেন। সেই মামলাকেই ঢাল বানিয়ে বারবার হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীর দাবি, প্রতিপক্ষরা আল আরাফাহ ব্যাংক, মৌলভীবাজার শাখায় জমি মর্গেজ রেখে ৩১/১০/২০১৮ পর্যন্ত ৯ কোটি ২ লক্ষ ৫ হাজার ৪৫০ টাকা ঋণ নিয়েছেন। ব্যাংক পরবর্তীতে জমিতে সাইনবোর্ডও লাগিয়েছে। অথচ মেট্রোপলিটন কমিশনার কার্যালয় থেকে ২৬/০১/২০২০ তারিখের চিঠিতে তাদের বসতবাড়ীর ৬৯৬ দাগে কোনো অধিগ্রহণের কথা নেই।

সামছুন নাহারের ভাষ্য, গত ২৬/০৮/২০২৬ ইং রাত ১.৩০ মিনিটে আসামিরা বাড়ির নৈশ প্রহরীকে সিসি ক্যামেরার আওতার বাইরে নিয়ে বেদম মারপিট করে। হুমকি দেয়, “আর কখনো গ্যারেজ ও বসতবাড়ীর আশেপাশে দেখলে হাত-পা ভেঙে দেব।
পরদিন ২৭ আগস্ট সকাল ১২.১৫ মিনিটে এবং রাত ৯.০৫ মিনিটে দুই দফায় বাড়ি ও গ্যারেজের সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। ৩০/০৮/২০২৬ ইং বিকেল ৪.৪০ মিনিটে ইট নিক্ষেপ করে ভেন্টিলেটরের ক্যামেরাও ভেঙে ফেলা হয়। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার টাকা। প্রতিটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ তার কাছে সংরক্ষিত আছে।
সবচেয়ে আতঙ্কের ঘটনা ঘটে গতকাল রাতে। সামছুন নাহার বলেন, “রাত ৯ টার দিকে তারা আবার হামলা করে। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকে শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করে। প্রাণভয়ে দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেট লাগিয়ে দেই। ৯৯৯ এ ফোন করলে দুইজন পুলিশ আসে।”
পুলিশ আসার পরও হামলাকারীরা তার ছেলের সাইকেল, কয়েকটি চেয়ার এবং হাঁস-মুরগির ঘর ভেঙে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গেলে তাদের উপরেও চড়াও হয় আকরাম ও তার ছেলে আদনান গং।
এ নিয়ে তাজহাট থানায় একাধিকবার অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালে সিআর-১৪৫/২০২৩ নং মামলা করেছিলেন। ১৬/০৬/২০২৩ তারিখে পুলিশ কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জী নোটিশ দিয়ে যাওয়ার ১০-১৫ মিনিট পরই আবার হামলা হয়। ১৪/০৭/২০২৬ তারিখে জিডি নং-৬৪৩ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সামছুন নাহারের সবচেয়ে বড় ক্ষোভ ওসি রফিকের ভূমিকা নিয়ে। তার অভিযোগ, ওসি তাকে সরাসরি বলেন, “একজন ফ্যাসিস্ট ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মানিক হত্যা মামলার আসামির পক্ষে আপনারা আসছেন।”
ভুক্তভোগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী কোনোদিন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপির ট্যাগ দিয়ে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার আওয়ামী লীগ নেতা বানিয়ে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মানিক হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। এটা সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। মামলায় স্বামীর নাম ঠিক থাকলেও বাবার নাম ও ঠিকানার সাথে কোনো মিল নেই। এরপরও পুলিশ তাকে খুঁজছে। সেই ভয়ে সে পলাতক।”
“স্বামী পলাতক বলে কি আমরা নিরাপত্তা পাব না? আমরা কি এই দেশের নাগরিক না? আমার দুইটা ছোট বাচ্চা আছে। রাতে ঘুমাতে পারি না। কখন আবার হামলা হয় সেই আতঙ্কে থাকি,” বলেন তিনি।
ওসি রফিক পরে বলেন, “আমার ছুটির অর্ডার হয়েছে। আপনারা অভিযোগ দেন, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।” এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই।
স্থানীয়রা বলছেন, “যেখানে দলিল আছে, খারিজ আছে, খাজনা দেওয়া আছে, সেখানে মালিক ভুয়া হয় কিভাবে? আদালতের রায় থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট-কমিশন নিয়ে উচ্ছেদ করুক। নিজেরা আইন হাতে তুলে নেবে কেন?”
তাদের অভিযোগ, আদনান এলাকায় নেশাগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত। প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ভাঙিয়ে সে এসব অপকর্ম চালাচ্ছে। সাক্ষী হিসেবে রায়হান কবির, মিজানুর রহমান, সাহারা বেগমসহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করেছেন সামছুন নাহার।
স্বামী পলাতক থাকায় এখন সামছুন নাহার একাই দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিদিনকার হামলা-ভাঙচুরে পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
তিনি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা কামনা করেছেন।
একটি পরিবার শুধু নিজের কেনা জমিতে শান্তিতে বাঁচার অধিকার চাইছে। প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপই এখন তাদের শেষ ভরসা।
আপনার মতামত লিখুন :