BRTA উত্তরা দিয়াবাড়িতে কাউসার- হাফিজুরের কথায় শেষ কথা, দুই সহকারী পরিচালক বশির-মঈনুল থাকেন ঠুঁটোজগন্নাথ হয়ে


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৪, ২০২৬, ৮:৪৭ AM / ০
BRTA উত্তরা দিয়াবাড়িতে কাউসার- হাফিজুরের কথায় শেষ কথা, দুই সহকারী পরিচালক বশির-মঈনুল থাকেন ঠুঁটোজগন্নাথ হয়ে

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, ঢাকা:

রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ির BRTA অফিসে ঘুষ দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড পরিদর্শক কাওসার আলম ও হাফিজুর রহমান খান গোটা অফিসকে বানিয়েছেন ঘুষ দুর্নীতির অভয়ারণ্য। এখানে তাঁদের কথায় শেষ কথা৷ তাঁদের কাছ থেকে সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত দু’জন সহকারী পরিচালকও বসে থাকেন ঠুঁটোজগন্নাথ হয়ে। এই দুই সহকারী পরিচালক হলেন, বশির উদ্দিন, ফিটনেস, রেজিষ্ট্রেশন শাখা ও অপরজন হলেন, মঈনুল ইসলাম ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখা।

আশিকুর রহমান (উচ্চমান সহকারী),কাউসার আলম (মোটরযান পরিদর্শক), হাফিজুর রহমান( মোটরযান পরিদর্শক) এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট আজ পুরো উত্তরা দিয়াবাড়ি BRTA অফিসকে পরিণত করেছে ঘুষ দুর্নীতি ও জালজালিয়াতির অভয়ারণ্যে। যদিও অতি সম্প্রতি উচ্চমান সহকারী আশিকুর নরসিংদী BRTA তে বদলি হয়ে গেলেও কাওসার ও হাফিজুর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতি কর্মদিবসে লুটে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। আর তাদের ঘুষ দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্যের কারণে দিয়াবাড়ি BRTA তে ঘুষ ছাড়া নড়েনা ফাইল, মেলেনা সেবা৷

এই ছবির সকলেই ১ থেকে ৫ বয়সে মুজিবনগর সরকারের কথিত কর্মচারী পরিচয়ে শিশুকালেই মাতৃক্রোড়ে দগ্ধপান করাকালীন সময়ে হয়েছেন এক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা(?) ফলে পতিত আওয়ামী সরকারের ইঙ্গিতে আদালত কর্তৃক বিশেষ নির্দেশে ২০০৯ সালে পেয়েছেন লোভনীয় সাব রেজিস্ট্রার পদ, আর টানা ১৬ বছর আমজনতার পকেট কেটে হয়েছেন কোটিকোটি কালোটাকার মালিক।( ফাইল ছবি)

সরেজমিনে দিয়াবাড়িতে তথ্য সংগ্রহের জন্য ভুক্তভোগী গাড়ি মালিক, স্থানীয় সূত্র ও অফিসের ভেতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু স্টাফের সাথে কথা বললে উঠে আসে পিলে চমকানো তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিটি কাজের জন্য দালালদের মাধ্যমে আগে কাওসার আলম ও হাফিজুর রহমান খানের পকেটে টাকা গুঁজে দিতে হয়, তারপর হয় কাজ শুরু।

অভিযোগকৃত ঘুষের হার যথাক্রমে,

রেজিস্ট্রেশন ক্লিয়ারেন্স– ৫,০০০–১০,০০০ টাকা। ফিটনেস নবায়ন– ৩,০০০–৫,০০০ টাকা এবং নাম ট্রান্সফার– ১০,০০০–১৫,০০০ টাকা।
এই টাকা কালেকশনের জন্য অফিসের ভিতরে বাইরে সক্রিয় কমপক্ষে ৩ ডজন চিহ্নিত দালাল। দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংগৃহীত সমুদয় ঘুষ দুর্নীতির টাকা সরাসরি অথবা দালাল সর্দারের মাধ্যমে পৌঁছে যায় মোটরযান পরিদর্শক কাওসার আলম ও হাফিজুরের পকেটে।
কালেকশনকৃত এসব টাকা পরিদর্শক কাওসার আলম ও হাফিজুর ৬০ শতাংশ রেখে দিয়ে বাকি টাকার ৩০% দুই সহকারী পরিচালক ও বাকি ১০% টাকা অফিস স্টাফদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে দেন।

সাংবাদিক পেটানো, সত্য গোপনের কৌশল :

সম্প্রতি খবর বাংলাদেশ পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক সুমন খান দিয়াবাড়ী BRTA অফিসে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে অফিসের ভেতরেই সুমনের ওপর হামলা চালানো হয়। কাওসার আলম, উচ্চমান সহকারী আশিকুরের নেতৃত্বে হামলার সময় কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোন, ভেঙে ফেলা হয় ক্যামেরা। পরে আবার ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা দেওয়া হয় ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে।
মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিক মহল বলছে— এটি কেবল দুর্নীতি রক্ষার কৌশল নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সরাসরি আঘাত।

দিয়াবাড়ি থেকে সদ্য নরসিংদীতে বদলি হওয়া আশিকুর রহমান নানাবিধ ঘুষ দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্য চালিয়ে গেলেও টানা ৬ বছর সে দিয়াবাড়িতে ছিলো পতিত আওয়ামীলীগের এক প্রভাবশালী নেতার নিকট আত্মীয় পরিচয়ে। আশিকুর রহমান দিয়াবাড়ী থাকাকালীন সময়ে গড়েছেন নামে বেনামে অবৈধ সম্পদের পাহাড়। শুধু তাই নয়, মিরপুর এলাকায় আশিকুরের নামে দুটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্য প্রমাণও এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে।

কাউসার আলম ও হাফিজুর – মাঠ পর্যায়ের ‘রাজা’:

অফিসের ভেতরে দালালদের সক্রিয় করার মূল ভূমিকায় আছেন হাফিজুর রহমান ও কাউসার আলম। গাড়ির ফাইল আটকে রাখা, টাকা ছাড়া কাজ না করা, দুপুরে ফেল সন্ধ্যায় পাশ সিস্টেম, শূণ্য পাওয়া এবং নাম সহি করতে না পারা প্রার্থীকে পাশ করিয়ে দেওয়া— সবকিছু তাদের নির্দেশেই হয় বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগীরা জানান, “যদি টাকা না দাও, তোমার ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকবে।” স্বয়ং BRTA চেয়ারম্যান মহোদয় ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে আসলেও সরকারী খরচের টাকা বাদেও কাউসার আলম অথবা হাফিজুরকে দিতে হবে নূন্যতম ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা।

দালাল বাহিনী – প্রকাশ্য দাপট :

অন্তত ৩০ জন দালাল— জাকির, রনি, শাহিন, প্রমূখ অফিসে অবস্থান করে। প্রকাশ্যেই তারা টাকা নেন, রসিদ দেন না। এমনকি নতুন দালালদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কীভাবে গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলা যায়। প্রশ্ন উঠছে— এরা অফিসে প্রতিদিন কীভাবে এত নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করে?

প্রশাসনের রহস্যময় নীরবতা :

এতসব অভিযোগের পরও বিআরটিএ প্রশাসন এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ— উপরের কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত ভাগ পান। ফলে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

সাংবাদিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের দাবি :

মোটরযান পরিদর্শক কাউসার আলম ও হাফিজুর রহমানকে অবিলম্বে বরখাস্ত করা, স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা, সাংবাদিকের ওপর হামলার আইনি প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার করা, দালালচক্র ভেঙে ফেলা এবং অফিসে সিসিটিভি ও অভিযোগ বক্স স্থাপন করা বাধ্যতামূলক বলে মনে করেন সাংবাদিক সমাজ।

সাধারণ মানুষের বক্তব্য:

একজন গাড়ি মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিআরটিএতে গেলে সবাই জানে কাকে কত টাকা দিতে হবে। প্রতিবাদ করলে ফাইল আটকে দেয়।”

একজন ভেতরের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখানে কাজ করতে গেলে নিয়ম নয়, মানুষ চেনে কাকে কত দিতে হবে— সেটাই নিয়ম।”

উপসংহার :

উত্তরা দিয়াবাড়ি বিআরটিএ অফিসে দুর্নীতির এই চিত্র কেবল একটি অফিসের নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যর্থতা দায়িত্বে অবহেলার প্রতিচ্ছবি। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ভেঙে পড়বে। আর কাওসার ও হাফিজুর রহমান এর মতো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে ইতোমধ্যে BRTA’র সারাজীবনের সেবামূলক অর্জন মুখথুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।।