ঢাকার রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ওরা ১১জন,কোটিপতি ওমেদার-ঝাড়ুদার।। পর্ব-১


আজকের পেপার প্রকাশের সময় : মার্চ ৩, ২০২৬, ৪:০৭ AM / ০
ঢাকার রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ওরা ১১জন,কোটিপতি ওমেদার-ঝাড়ুদার।। পর্ব-১

সজীব আকবর, অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:

রাজধানী তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের কোটিপতি ওমেদার ঝাড়ুদার রয়েছে অনেকেই। শূন্য থেকে শতকোটি টাকার মালিক রয়েছেন ৬০ টাকা দিন হাজিরার ওমেদার ও ঝাড়ুদারদের মধ্যে। ঢাকা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স জুড়ে দুর্দান্ত দাপটে চলছে এক ভয়াবহ সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মধ্যে ওমেদার, ঝাড়ুদার, পিয়ন, মোহরার, এক্সটা মোহরার, রেকর্ড কিপার সহ শতাধিক ব্যক্তির নাম থাকলেও সারাবছর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ওরা ১১ জন।

বর্তমানে এই ১১ জনের মধ্যে বহুল আলোচিত নাম মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের নকলনবিশ আওলাদ হোসেন, আওলাদের ভাই আকিব হোসেন, সাব রেজিস্ট্রার সহকারী হারিচ, গুলশান সাব রেজিস্ট্রার অফিসের পিন্টু, মঞ্জু, পল্লবীর  জসিম, রাজিব, ধানমন্ডির রানা, খিলগাঁওয়ের রাসেল, মেহেদি, উত্তরা সাব রেজিস্ট্রার অফিসের ঝাড়ুদার থেকে শতকোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া মঞ্জু, মানিক, শ্যামনগর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের কোটিপতি উমেদার তাজুল ও ইমরান এইরকম ৫ডজন ওমেদার, মোহরার, অফিস সহায়ক, নাইটগার্ড, ঝাড়ুদার সাব রেজিস্ট্রার সহকারীদের হাতে গোটা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স এখনো জিম্মি।

সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম, সাবেকুন নাহার, আইজিআর শহিদুল ইসলাম ঝিনুক মহোদয়কে এরা যেমন কারাবন্দি আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নাম ভাঙিয়ে কোনঠাসা করে রাখতো। বর্তমানেও ঢাকা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে এরা জেলা রেজিস্ট্রার (DR) মুন্সি মোখলেছুর রহমানকেও তারা থোড়াই কেয়ার করেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

ওমেদার ও নকলনবিশদের গডফাদার বর্তমানে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবিশ আওলাদ হোসেন ও সবুজ। আওলাদের সকল দুর্নীতির রাজসাক্ষী তার সহোদর উমেদার আকিব হোসেন। আর তাদেরকে সবুজ সংকেত দেখিয়ে আসছেন সাব রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদির ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হারিচ।

বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ঘুষ দুর্নীতির অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স ঢাকা পরিণত হয়েছে ঘুষ দুর্নীতি, জাল দলিল সম্পাদন, ভলিউম লোপাট, টেম্পারিং, ভলিউমের পাতা চুরি, খাস খতিয়ান ও শত্রু সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় ও ডেভলপার কোম্পানির নামে রেজিষ্ট্রেশন করার এক নিরাপদ তীর্থস্থান হিসেবে।। এ কমপ্লেক্সরই জমি রেজিস্ট্রেশন, দলিল সম্পাদন, নকল উঠানো, রেকর্ড তল্লাশি, সংশোধন এমনকি জমির শ্রেণী পরিবর্তনের নামে ঘুষ গ্রহণসহ বিস্তর দুর্নীতি এবং ব্লাকমেইলিংয়ের কারণে সেবা প্রত্যাশীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে টানা তিন যুগ ধরে। এরমধ্যে ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময় থেকে ঘুষ দুর্নীতির পারদ চড়তে থাকে দফায় দফায়। যা জুলাই বিপ্লবের পরবর্তি সময়েও কোন পরিবর্তন হয়নি বরং ঘুষের রেট প্রতিদিন বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

কর্মকর্তাদের প্রিয়জন হিসেবে খ্যাত আওলাদ, আকিব, হারিচ ঘুরেফিরে এরাই শোষণ করছে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসকে বছরের পর বছর।  এদের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিস। রেজিস্ট্রেশন অফিসের ভূমি সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ ঘুষের নেটওয়ার্ক, জাল-জালিয়াতি সিন্ডিকেট। এরা কখনো অস্তিত্বহীন ব্যক্তিকে মালিক সাজিয়ে কখনো বা ভূয়া কমিশনে দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জমি প্রভাবশালীদের লিখে দেওয়া, আর এসব অপকর্ম করে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। দিনের বেলা শুধু অফিসের কর্ম ঘণ্টাতেই শুধু নয়, রাতের আঁধারেও এ দপ্তরে চলে তাদের ভয়াবহ সিডিকেটের বেআইনী অপতৎপরতা ।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফখরুদ্দিন ক্ষমতাসীন হয়ে আসলে দেশের অবস্থা কঠিন হয়ে যায়। শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া সহ বাঘা বাঘা নেতা আমলা মন্ত্রীদের জেলে পাঠায় ওয়ান ইলেভেন সরকার।

সে সময় দুর্নীতিগ্রস্ত অন্যান্য সরকারি অফিসের ন্যায় সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা প্রশাসনের ভয়ে ঘুষ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তখন ঘুষ নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় উমেদারদের। কেননা উমেদাররা গ্রেফতার হলে কর্মকর্তারা বলতে পারবেন তিনি তাদের কেউ না। এই সুযোগটাই কাজে লাগান উমেদাররা। সেই থেকে সব ঘুষের টাকা লেনদেন হতে থাকে উমেদারদের মাধ্যমে। সাব-রেজিস্ট্রারদের নামে দলিল ভেদে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতে শুরু করে এসব উমেদাররা। এর মধ্যে নামমাত্র টাকা দেয় সাব রেজিস্ট্রার ও অন্যান্য কর্মচারীদের। বাকি টাকা পুরোটাই আত্মসাৎ করতে থাকেন উমেদার রানা, আকিব, মঞ্জু, রাজিব, ইমরান, তাজুল,মেহেদি গংরা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে আঙ্গুল ফুলে তালগাছ বনে যায় উমেদার, ঝাড়ুদার, পিয়ন ও নকলনবিশরা। এর পরপরই রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সে ক্রমশঃ অবৈধ টাকার শক্তিতে এরা হয়ে উঠে প্রধান নিয়ামক। অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এদের ভয়ে তটস্থ থাকেন এখনো। সবাই এদেরকে সমীহ করে চলতে থাকেন।
অপরদিকে আওলাদ, আকিব ও হারিচ রয়েছে মোহাম্মদের সাব রেজিস্ট্রি অফিসে চুড়ান্ত ফর্মে। তারা বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার আ: কাদিরের সামনেই প্রতিদিন পাবলিকের পকেট থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। পূর্বতন সাব রেজিস্ট্রার শাহিন মিয়া ঘুষ দুর্নীতির ৫০% নিজে রেখে দিতেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে মোহাম্মদপুরের বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার আ: কাদির সিন্ডিকেট ও সেরেস্তার নামে আদায় হওয়া টাকার কতো পার্সেন্ট নিজের ঝুলিতে রাখেন তা এখনো জানা যায়নি। তবে সূত্রগুলো দাবি করেছেন তিনি কালেকশনকৃত টাকার ৪০% এবং দলিল মূল্যের উপর লাখে ১ হাজার টাকা দলিল প্রতি নিয়ে থাকেন।

দুই ভাই আওলাদ আকিবের সংক্ষিপ্ত খতিয়ান 

দুই ভাইয়ের সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কব্জায় পরিণত হয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিস। অভিযোগ উঠেছে, দুই ভাই দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করে দলিল জালিয়াতি ও দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে বছরের পর বছর চাকরি করে যাচ্ছেন। দুই ভাই হলেন, আওলাদ হোসেন ও আকিব হোসেন। তারা দুইজনই মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত এক্সট্রা মোহরার (নকলনবিস) হিসেবে কর্মরত।

সাব রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ১০ বছর ধরে নকলনবিস আওলাদ হোসেন একই অফিসে চাকরি করছেন এবং নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট দফতর। এসব অনিয়ম ঢাকতে তার ছোট ভাই মো. আকিব হোসেনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন পুরো অফিস। তেজগাঁও সাব রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু দলিল লেখক, স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও স্থানীয় কিছু চিহ্নিত দালালদের সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেটের যোগসাজসে সরকারি নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে নানান ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন আওলাদ হোসেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নকলনবিস বৃহস্পতিবার (৩০ মে) সারাবাংলাকে জমি কেনাবেচার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি হচ্ছে বালাম বই আর আওলাদ হোসেন চাকরিতে যোগদানের পর হতে এখন পর্যন্ত কোনো বালাম বই সঠিকভাবে সম্পাদন করেননি। যার সত্যতা মিলবে যদি সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আওলাদ হোসেন বিভিন্ন সময় বালাম বই ঘষামাজা এবং ছিঁড়ে ফেলে সেবা প্রত্যাশীদের চাপের মুখে ফেলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।’

মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, নকলনবিস আওলাদ হোসেন বিভিন্ন দলিল লেখকদের স্বাক্ষর/সই নকল করেও বিভিন্ন অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতে নিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, আওলাদ হোসেনের ছোট ভাই মো. আকিব হোসেন অবৈধ পন্থায় কোনো ধরনের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ক কাগজপত্রাদি ছাড়াই মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কাজ করে চলেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নাড়াচাড়া করছেন যা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার এক নিকট আত্মীয় জানান, আওলাদ হোসেন আগে ইয়াবার ব্যবসা করতেন এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পাঁচ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন।

আওলাদ হোসেন তেজগাঁও কুনিপাড়ায় পাঁচতলা আলিশান বাড়ি, টঙ্গী, বাড্ডা, হাতিরঝিলে তার বাবার জায়গায় নিজের অর্থায়নে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি ও জমি ক্রয় করেছেন। সিলেটের সুনামগঞ্জে প্রায় তিন একরের বেশি জায়গার ওপরে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি মাছের ঘেরও করেছেন।
ইয়াবার মামলায় তিনি ২ নম্বর আসামি। ওই মামলায় আওলাদ তিন মাস জেলও খেটেছিল। এরপর ওই মামলায় তিনি খালাস পান। ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর তেজগাঁও এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় একটি মামলা হয়। সেই মামলা আওলাদ হোসেন ৪ নম্বর আসামি। মামলাটির এখনো চার্জশিট হয়নি।

সাব রেজিস্টার সহকারী হারিচ

মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সাব রেজিস্টার আব্দুল কাদির এর কথিত সহকারী হারিচ এই অফিসের দুর্নীতিকে আরও সংগঠিত, পরিকল্পিত ও ভয়াবহ স্তরে নিয়ে গেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে সেবা গ্রহীতা ও দালালদের মুখে মুখে।

এখানে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল নিবন্ধনের প্রতিটি ধাপে ঘুষ বাধ্যতামূলক করেছেন হারিচ। কেউ ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখা হয় বা বিনা কারণে ত্রুটি দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। অফিসের দালাল চক্রকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়। যারা বাধ্য হয়ে ঘুষ দেন, তাদের কাজ অল্প সময়েই সম্পন্ন হয়—এ যেন প্রতিষ্ঠিত ‘দুর্নীতির কাস্টমার সার্ভিস’।

এই অফিসে দুর্নীতির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক পরিচালনায় সরাসরি সহায়তা করেন সাব রেজিস্টার সহকারী হারিচ। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা হারিচ গত কয়েক বছরে অবৈধভাবে আয় করেছেন কোটি কোটি টাকা—এমন অভিযোগ স্থানীয় সূত্রের। তার নিজ গ্রামে ইতোমধ্যে পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করেছেন, যার নির্মাণব্যয় তার বেতন-ভাতার সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শুধু তাই নয়, রাজধানীর মিরপুর এলাকায় রয়েছে হারিচের নামে বাড়ি ও একাধিক ফ্ল্যাট। তার আর্থিক সাম্রাজ্য দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠছে।
মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন যে পরিমাণ ঘুষ লেনদেন হয় তার একটি বড় অংশ আসে হারিচের পকেটে। সাব রেজিস্ট্রার,ডিআর, আইজিআর অফিসের নামে হারিচ এসব টাকা নিজের বাসায় নিয়ে যান। হারিচ ব্যক্তিগত নির্দেশে ঘুষের হার নির্ধারণ থেকে শুরু করে দালালদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ সব তিনি নিজেই তদারকি করেন।
এই হারিচ, সোবহান, আওলাদ, বাবু হাওলাদার ও আকিব দলিল নিবন্ধনের মৌলিক সরকারি সেবাকে তারা ব্যক্তিগত লুটপাটের উৎসে পরিণত করেছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কোনো কঠোর তদারকি না থাকায় দুর্নীতিবাজদের দাপট আরও বেড়ে গেছে। যত দিন না এসব দুর্নীতির শিকড় উন্মোচন করে শাস্তির আওতায় আনা হবে, ততদিন সাধারণ মানুষের আর্থিক ও সামাজিক ভোগান্তি অব্যাহত থাকবে—এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা।

পল্লবীর জসিম-রাজিবের কোটি টাকার সাম্রাজ্য


রাজধানীর তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পল্লবী জোনে বহু বছর ধরে চলছে দুর্নীতি, দালালি ও ঘুষের রাজত্ব। আর এর নেতৃত্ব দিচ্ছে কথিত ‘উমেদার সিন্ডিকেট’, যার মূল হোতা উমেদার জসিম। মাত্র ৬০ টাকা দৈনিক হাজিরার বেতন থেকে শুরু করে আজ তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক।

তার সঙ্গে আছেন আরেক উমেদার রাজিব, দু’জনে মিলে পুরো অফিসকে পরিণত করেছেন দুর্নীতির আখড়ায়।  সাব রেজিস্ট্রার জাহিদুল হকের সবুজ সংকেত পেয়ে ওমেদার রাজিব ও জসিম কথায় কথায় ঘুষ নেন। সন্ধ্যার পর সেরেস্তা আর বড়ো স্যারের ইফতারির নামে আদায়কৃত টাকা অর্ধেক সাব রেজিস্ট্রার কে দিয়ে বাকি টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। 

ঘুষের টাকা দিয়ে জসিম রাজধানীতে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট গড়ে তুলেছেন। উমেদার জসিমের জীবনের শুরুটা ছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। গার্মেন্টসে কাজ করতেন, সংসার চলত টানাপোড়েনে। পরে এক আত্মীয়ের সহায়তায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঝাড়ুদারের কাজ পান। তখন প্রতিদিন মাত্র ৬০ টাকা হাজিরা ছিল তার আয়। কিন্তু আজকের দিনে সেই জসিম রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি, জমিজমা ও বিদেশে ব্যবসার মালিক।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জসিমের রয়েছে—

মিরপুর শাহ আলীবাগ ৩৭/এ নম্বর বাড়িতে তিনটি ফ্ল্যাট

মিরপুর গার্ডেনে শাশুড়ির নামে এক কোটি টাকার ফ্ল্যাট

সাভার মসূরীখোলা এলাকায় ১৫-২০ শতাংশ জমি

ময়মনসিংহ ভালুকায় গরুর খামার

সৌদি আরবে যৌথ ব্যবসা

দামি হাইয়েস মাইক্রোবাস ও নোয়া গাড়ি (ভাই গিয়াস উদ্দিনের নামে)

গ্রামে (শরীয়তপুর ভেদরগঞ্জ) একাধিক জমি ও পাকা বাড়ি

এলাকাবাসীর মতে, এসব সম্পদের বাজারমূল্য কয়েক দশক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অথচ জসিমের অফিসিয়াল আয় এখনও দৈনিক মাত্র ৬০ টাকা।

চায়ের ফেরিওয়ালা থেকে কোটিপতি উমেদার রানার হাতে ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের চাবিকাঠি 

ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের ওমেদার রানা আহাম্মেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলিল দাতা-গ্রহিতা ও দলিল লেখকদের জিম্মি করে প্রতিদিন অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
এছাড়াও ওমেদার রানা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সহকারী, পিওন ও নকল নবীশদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে রেখেছে। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ কোন টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৭/৮বৎসর পূর্বে এই রানা রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে চা বিক্রি করতো। তখন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের দুর্নীতিবাজ টাইপিষ্ট মতিউর রহমান সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল জলিলকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ধানমন্ডি অফিসের ওমেদার পদে নিয়োগ দেয়। তার কিছুদিন পরই ওমেদার রানা নানাভাবে জনহয়রানী করে দুর্নীতির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া শুরু করে। জনহয়রানী ও উৎকোচের অভিযোগে ওমেদার রানাকে ঢাকার তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার দিপক কুমার সরকার, আশুলিয়া অফিসে বদলী করে। ৩ মাস পর অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে পূনরায় রানা ধানমন্ডি অফিসে যোগদান করে অফিসটি ঘুষ দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত করেছে। এদিকে রানা ধানমন্ডি অফিসে ওমেদারী করে কয়েক কোটি টাকা অবৈধ উপার্জন করে
হাতিরঝিল মহানগর হাউজিংয়ে ৩য় তলায় কেনা ১৮শ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
এই বিল্ডিংয়ে তার আরো একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া রামপুরা বনশ্রীতে ৪তলা বিলাসবহুল বাড়ির ও মালিক হয়েছেন।
তার গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার দাগনভুইয়ায় কিনেছেন প্রায় ৩০ একর জমি ও ৫টি দোকান।
শুধু তাই নয় ৩টি হাইয়েছ মাইক্রো কিনে রেন্ট এ কার’এ ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। নিজে বিলাসবহুল প্রাইভেট কারে ও চলাফেরা করে থাকেন।

উত্তরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে মানিক ও মঞ্জুর কথায় শেষ কথা

ঢাকা তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স উত্তরা সাব রেজিস্ট্রার অফিস বহু বছর ধরে ঘুষ দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ক্রেতা বিক্রেতারা দলিল করতে গেলেই ধরা পড়তে হয় সিন্ডিকেটের হাতে। উত্তরা অফিসে ৭ সদস্যের সিন্ডিকেটের প্রধান হলো নকল নবীশ মানিক ও ঝাড়ুদার মঞ্জু।

তাদের হাতে জিম্বি হয়ে পড়েছে সাব রেজিস্ট্রার, দলিল লেখক, উমেদার, পিয়ন থেকে ক্রেতা বিক্রেতারা। এই অফিসে যার মাধ্যমে দলিল করতে যাক না কেনো সেই দলিলের ৫% অতিরিক্ত ঘুষ দিতে হয় এই নকল নবীশ মানিক ও ঝাড়ুদার মঞ্জুদের।
উমেদার রাজু ও নকল নবীশ মোবারক ব্যক্তিগত ঝামেলায় দীর্ঘ ১০ বছর অফিসে অনুপস্থিত ছিল।তারা অফিসে ১০ বছর কোন কাজ করেননি। এমনকি হাজিরাও দেননি অথচ ওই ২ জনের নিকট থেকে মহিউদ্দিন মানিক, তৎকালীন সময়ের সাব রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লা ও ঝাড়ুদার মঞ্জু মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনরূপ অনুমোদন না নিয়েই দীর্ঘ ১০ বছর পর পুনরায় কাজ করার অনুমতি দিয়ে কাজে যোগাদান করিয়েছে।

ঝাড়ুদার মঞ্জু উত্তরা অফিসের জাল দলিলে নিরীক্ষার কাজ করে তৎকালীন সময়ের সাব রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লার সাথে শলা পরামর্শ করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দলিল করিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সেই সময়ের কিছু দলিল নং ৪৬২০ ও ৪৬২২ বলে জানা যায়। অতি আশ্চর্য বিষয় হল ঝাড়ুদার মনজুরুল হক মঞ্জুর নিজের ঝাড়ুদার হয়েও তার আপন ভায়রার ছেলে রাজীবকে ঝাড়ুদার পদে চাকরি দিয়েছেন। রাজিব কে প্রতিদিন ১০০০ (এক হাজার টাকা) করে দিয়ে থাকেন মঞ্জু। অথচ তার দৈনিক হাজিরা হচ্ছে মাত্র ৬০ (ষাট টাকা)। জীবন নামে আরেকটি ছেলেকে সরকারি চাকরি হিসেবে রেখেছে তার কাজ হচ্ছে ক্রেতা বিক্রেতারা দলিল করতে আসলে সেই দলিল ধরে মঞ্জুকে দেওয়া। সেই বাবদ জীবনকে দৈনিক ১০০০ (এক হাজার টাকা) হাজিরা দিয়ে থাকে মঞ্জু।

এইসব দুর্নীতি করে ঝাড়ুদার মঞ্জু গড়ে তুলেছেন উত্তরায় কামাড়পাড়ায় আলিশিয়ান ৭ তলা ভবন ও ১টি ৬ তলা ভবন। নামে বেনামে গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। চলেন বিলাস বহুল গাড়িতে যার মূল্য ৬০ লাখ টাকার উপড়ে।
অতি আশ্চর্য বিষয় হলো এই ঝাড়ুদার মঞ্জুর দৈনিক হাজিরা হচ্ছে মাত্র ৬০ টাকা অর্থাৎ (৬০×২৫=১৫০০ শত টাকা) যার মাসিক ইনকাম ১৫০০ শত টাকা সে কি ভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন ??

দুদকের চোখে ধুলা দিয়ে এই ভাবেই অবৈধ সম্পদ করে তুলছেন নকল নবীশ মানিক ও ঝাড়ুদার মঞ্জু অথচ ঝাড়ুদার মঞ্জুর নিয়োগ পত্রটি ভূয়া ও জাল। কারণ মঞ্জুরুলের নিয়োগ অনুমোদনটি নিবন্ধন অধিদপ্তরের কোন আইজিআর প্রদত্ত নয়। সেটা আছে তৎকালীন জেলার রেজিস্ট্রার প্রণব কুমার ভৌমিকের নামে ১১/০৯/১১ ইং তারিখে স্বাক্ষর করা। ওই সাক্ষরটি আজও আসল কিনা তাও সন্দেহজনক।

ঝাড়ুধার মঞ্জুর বিরুদ্ধে পতিত আওয়ামী লীগের সময় তার ছেলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে উত্তরায় মিছিল মিটিং ভাংচুর করতো। ৫ই আগষ্ট আওয়ামী লীগ পতনের পর ছাত্র জনতা তার বাসায় সেনাবাহিনী সহ অভিযান চালিয়ে দেশীয় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে কিন্তু ভাগ্য ভাল থাকায় তার ছেলে পালিয়ে যায়।

সম্পদের পাহাড় গড়েছেন নকল নবিশ আতাউর রহমান

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ‘নো ওয়ার্ক, নো পেমেন্ট’ পদ্ধতিতে চাকরি করা এক্সট্রা মোহরার বা নকল-নবিশরা পাতা প্রতি পান মাত্র ২৪ টাকা। সারাদেশে এমন নকল নবিশের সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। সে হিসেবে একজন নকল নবিশের মাসে আয় ১৫/২০ কিংবা ২৫ হাজার টাকার বেশি নয়। বর্তমান বাজারে এই সামান্য টাকায় পরিবার নিয়ে দু’বেলা ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকাই দায়। অথচ, বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাটসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নকল নবিশ আতাউর রহমান। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়েছেন তিনি। সম্প্রতি দুদকে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন জনৈক ভুক্তভোগী।

গত ২৫ মার্চ দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগ থেকে জানা যায়, ভুয়া নামজারীর মাধ্যমে দলিল করা, খাজনা আদায়ের রশিদ ছাড়া দলিল করা, গৃহায়নের সেল পারমিশন বহিভূর্ত ফ্ল্যাটের দলিল করা, দলিলে ফিস দাগানোর নামে অবৈধ আয়ের টাকায় আতাউরের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় বিভিন্ন দাগে ৮ বিঘা জমি কিনেছেন। রাজধানীর মিরপুরে ৬০ ফিট রোডের পাশে ৫ কাঠার একটি প্লট, ক্যান্টনমেন্ট মানিকদি বাইগারটেকে একটি ফ্ল্যাট। সাভারের আকরান বাজার ভাগ্নি বাড়ীতে টিনশেড বিল্ডিংসহ ১২ কাঠা জায়গা কিনেছেন। এছাড়াও তিনি ২০২৩ সালের ৩০ মে রামপুরা পূর্ব চৌধুরীপাড়ায় কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনেছেন (দলিল নং-৫৯৫৮) যা খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিকৃত। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সময়ে ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের গোপন তথ্য ফাঁস করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন আতাউর রহমান।

অভিযোগ মতে, নিষেধাজ্ঞাকৃত সরকারি কেয়ারি সম্পত্তির রেজিস্ট্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন নকল নবিশ আতাউর। ২০১৭ সালে ধানমন্ডি অফিসে আসার পর ভ্যাট ও এআইটি সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ ছিলো আতাউরের দখলে। এই সুযোগে টানা তিন বছর পে-অর্ডারের টাকা আত্মসাৎ করার পর ২০২০ সালে ধানমন্ডির তখনকার সাব-রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লা হাতে-নাতে ধরেন আতাউরকে। এ বিষয়ে লিখিত প্রমাণসহ জেলা রেজিস্ট্রার, ঢাকা বরাবর চিঠি প্রেরণ করেন লুৎফর রহমান মোল্লা। পরবর্তিতে জেলা রেজিস্ট্রারকে অঙ্গীকার দিয়ে সমঝোতা করেন আতাউর রহমান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আতাউরের এক সহকর্মী জানান, “নুন আনতে পান্তা ফুরানো মানুষ ছিল আতাউর। তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে থাকাকালীন তিনি ভাড়া বাসায় থাকতেন, ঠিকমতে ভাড়াও দিতে পারতেন না। ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদানের পর থেকেই শুনছি আতাউর এখন কোটিপতি। আইএফআইসি ব্যাংকে তার মাস্টার আকাউন্টও আছে। এ যেন জিরো থেকে হিরো বনে যাওয়ার গল্প। ঢাকায় আসার আগে আতাউর তার গ্রামে ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষকতা করতেন। অথচ গত কয়েক বছরের ব্যবধানে নামে বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন আতাউর।”

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখা-৭-এর দুই কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন চুক্তির মাধ্যমে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া মীর কাসেম আলীর জমি বেচা-কেনা এবং ফ্ল্যাট-দোকানের মালিকানা পরিবর্তন করেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আতাউর রহমান সিন্ডিকেট। মীর কাসেমের মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডের (প্লট-১৪৮জি (পুরাতন), ৬০ (নতুন); রোড নং ১৩৮ (পুরাতন), ২এ (নতুন)] ৯ কাঠা ৪ ছটাক জমির ওপর নির্মিত ‘কেয়ারী ক্রিসেন্ট’ নামে ১৩ তলা ভবনের ১২ তলায় ১,০৮৪ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট (এ-১১ ও এ-১২) হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল চক্রটি। ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি সময়ের মধ্যে দুটি ফ্ল্যাটের হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। দাতা হিসেবে কেয়ারী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামসুল হুদা এবং গ্রহীতা হিসেবে খন্দকার হাবিবার নাম উল্লেখ করা হয়। ফ্ল্যাট দুটি হস্তান্তরের আর্থিক মূল্য দেখানো হয় ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। অথচ তখনকার বাজারমূল্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট দুটির দাম ২ কোটি টাকার বেশি ছিলো।

শ্যামনগর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কোটিপতি উমেদার তাজুল ও ইমরান

শ্যামনগরসহ দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উমেদারদের (অস্থায়ী কর্মচারী/দালাল) কোটিপতি হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অফিসে ৬০ টাকা হাজিরায় কাজ করা উমেদারা ঘুষ, দলিল জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে নামে-বেনামে বাড়ি, গাড়ি, ফ্লাট ও অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। বিশেষ করে শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উমেদার ইমরান ও তাজুলের মতো অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়:
রাজধানীর শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উমেদার ইমরাব ও তাজুল নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার মালিক। একইভাবে তেজগাঁওয়ের জসিম ও ঢাকা সদর অফিসের লোকমানও অবৈধ উপায়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ:

এই উমেদাররা সাব-রেজিস্ট্রারদের নিয়ন্ত্রণ করেন এবং দলিলের প্রতিটি ধাপে মোটা অংকের ঘুষ নেন।
এসব উমেদারদের মাসিক বেতন নেই। দিন হাজিরা নামমাত্র (যেমন ৬০ টাকা), অথচ তাদের জীবনযাত্রা সান সৈকত দেখলে যে কারো চোখ কপালে উঠে যাবে।
তাজুল ও ইমরান দলিল প্রতি ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা করে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করেন। আর জমির কাগজপত্রে বা ভোটার আইডি কার্ডে নামের বানান ভুল থাকলে অপকৌশল  করে ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাল জালিয়াতির টাকায় তাজুল ৬৫ নং ওয়ার্ডে হোল্ডিং নং ২৫২/৩,মেরাজনগর বি ব্লক মেইন রাস্তার উপর গড়েছেন ১০ তলা আলিসান ভবন। গোপন সূত্রে জানা গেছে এই ১০ তলা ভবনের মালিক তাজুল সহ মোট ৪ জন। ২৯/০৭/২০২০ তারিখে সম্পাদিত ৩৯০২ দলিল মূলে স্ত্রী সাহারা বেগমের নামে একাধিক ফ্লাট ও প্লট রয়েছে। সাহারা বেগম কোনো চাকরী বা ব্যবসা করেন না, তথাপিও তার নামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

(এরপর আগামীকাল দ্বিতীয় পর্বে পড়ুন ৩ জনের আমলনামা)