
সজীব আকবর,অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
ঢাকা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সকল সাব রেজিস্ট্রারসহ জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান এর নেতৃত্বাধীন ঢাকা জেলার ২১টি সাব রেজিস্ট্রি অফিস এখন ঘুষ দুর্নীতি,জাল-জালিয়াতি ও লুটপাট বাণিজ্যের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এসব অফিসে ঘুষ ছাড়া মেলেনা সেবা,নড়েনা ফাইল। এই ২১ অফিসের ঘুষ দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতির লাগাম টেনে ধরার দায়িত্ব যাঁর কাঁধে সেই জেলা রেজিস্ট্রার( DR) ঢাকা মুন্সি মোখলেছুর রহমান নিজেই ঘুষ দুর্নীতির গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে চলেছেন। সাপ্তাহিক ও মাসিক কালেকশনের টাকা গুণে নেওয়া এবং ত্রৈমাসিক অফিস ভিজিটের নামে কোটি টাকা হাতানো, পদন্নোতি আর বদলি বাণিজ্য, নিকাহ রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়ন বাণিজ্যেই অকুণ্ঠ নিমজ্জিত মুন্সি মোখলেছুর রহমান।
এদিকে ঢাকা জেলার রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, দলিল সম্পাদনে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জেলা রেজিস্ট্রারসহ গুলশান ও মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মচারীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন এক ভুক্তভোগী।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান, মোহাম্মদপুরের সাব রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদের এবং গুলশানের সাব রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুন। গত ৩রা মে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১০.৬৬ কাঠা জমির একটি সাব-কবলা দলিল সম্পাদন করা হয় (দলিল নম্বর ৩৪৫৯)। অভিযোগে বলা হয়েছে, বাস্তবে জমিটি বসতভিটা হলেও দলিলে সেটিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে দেখানো হয়। এতে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি ও দলিল প্রক্রিয়ায় চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এ প্রক্রিয়ায় দাতা পক্ষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দলিল সম্পাদনে বাধ্য করা হয় এবং সরকারি রাজস্বের একটি বড়ো অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঢাকা জেলার অন্তত ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললেও জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। বরং কিছু ক্ষেত্রে তিনি অনিয়মে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন এমন অভিযোগও করা হয়েছে। জেলা রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অডিট ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অফিস থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অনিয়ম ও দলিল জালিয়াতির বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের নকল নবিশ আওলাদ হোসেন গত দেড় বছর ধরে বালাম বইয়ে কোনো তথ্য সংরক্ষণ করেননি। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তার বিরুদ্ধে সাবরেজিস্টারের এজলাসে ওঠারও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আওলাদ সাব রেজিস্ট্রার সহকারী হারিছ, তার আপন ভাই কথিত উমেদার আকিব, নকলনবিশ এনামূল, কোটিপতি উমেদার সোবহানের ভাগ্নে আয়নাল ও ইউসুফ কে নিয়ে এক ভয়াবহ সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাব রেজিস্ট্রারদের বানিয়েছেন শতকোটি টাকার মালিক তেমনি নিজেরাও হয়েছেন কোটিকোটি টাকার মালিক।

আর মোহাম্মদপুর সাবরেজিস্টার আবদুল কাদের নিজ টাকায় স্ক্যানার বসিয়েছেন গোপনীয় রেকর্ড রুমে। কিন্তু রেকর্ড রুমে এধরনের স্ক্যানার বসানোর কোনো নিয়ম নেই। স্ক্যনারের মাধ্যমে মানুষের দলিল স্ক্যান করা হচ্ছে। যাতে এক ধরনের আতঙ্কে ভুগছেন সংশ্লিষ্টরা। অফিসে স্ক্যানার মেশিন স্থাপনসহ কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রচলিত বিধির বাইরে গিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে দলিল সম্পাদনে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ ও রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অবশ্য এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাব রেজিস্ট্রারকে সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছেন নকলনবিশ গিয়াস।

অনুসন্ধানে প্রকাশ মুন্সি মোখলেছুর রহমানের অধীনস্থ ২১ টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের মাধ্যমে দলিল প্রক্রিয়া দ্রুত করার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলেন, এই চক্রকে প্রশ্রয় দিয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এসব অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত হলে রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনের ভেতরের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে দুইটি লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগগুলোর অনুলিপি সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও দেওয়া হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন বিভাগে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা বা চার্জশিটের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ চলতে থাকায় পুরো রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, ঢাকা জেলার ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ভয়াবহ অনিয়মের সাথে যুক্ত থাকার পরেও জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান কোন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। উল্টো তাদের রক্ষায় কাজ করে চলেছেন। এর মূলে রয়েছে অনৈতিক লেনদেন ও বিলাসী জীবনের হাতছানি।

অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদপুরের সাব রেজিস্টার আব্দুল কাদের গোপনে জাল জালিয়াতির বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, দালাল চক্রকে বাঁচানোর জন্য পাঁয়তারা চালাচ্ছেন, তিনি মোহাম্মদপুর অফিসে সরকারি বিধিবিধান ছাড়াই নিজের অর্থে এক আজব স্ক্যানার মেশিন কিনে সাধারণ পাবলিকের জমির দলিলের কাগজ স্ক্যানার মেশিনের সাহায্যে স্ক্যান করে নিজ হেফাজতে রাখছেন। এটা সম্পন্ন আইন বহির্ভূত বিষয়। দালাল চক্রকে ভালোভাবে প্রশ্রয় দিতেই এ কাজ করা হয়েছে। আর এই সাব রেজিস্টারকে সহযোগিতা ও প্রশ্রয় দিচ্ছেন জেলা রেজিস্টার মুন্সি মোখলেসুর রহমান। এদিকে মুন্সি মোকলেসুর রহমানের বিরুদ্ধে মাসোহারা নেওয়া, ২১ সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে অডিটের নামে প্রতি তিন মাস পরপর ১ কোটি ৫ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সাল থেকে মোখলেসুর রহমান ছুটিতে অফিস থেকে সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা করে গ্রহণ করে থাকেন। এখানে দেখা যায় ২১ টি অফিসে প্রতি সপ্তায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা পান। এছাড়া তিনি প্রতি মাসে প্রতিটি সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বিশ হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিচ্ছেন। অডিটের নামে প্রতি তিন মাস পর পর এক একটি সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকেই ৫ লাখ টাকা করে জোরপূর্বক আদায় করে থাকেন। এক্ষেত্রে ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ১ কোটি ৫ লক্ষ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া বদলি ও নিয়োগবএবং মৌখিক নিয়োগ বাণিজ্যর অভিযোগও রয়েছে। তবে সাব রেজিস্টাররা তাদের দোষ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান এর এসব ঘুষের চিত্র সামনে আনতে নারাজ।

এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানার সাব রেজিস্টি আব্দুল কাদের এবং গুলশান থানার সাব রেজিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন-এই তিন জনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও কেউই ফোন রিসিভ করেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাব রেজিস্ট্রার বলেন, মোহাম্মদপুরের সাব রেজিস্টার আব্দুল কাদেরের সহযোগিতায় কয়েকজন একটি সিন্ডিকেট করে জেলা রেজিস্টারকে মাসোহারা দিয়ে এই অফিসের ঘুষ দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন।
রেজিস্ট্রেশন অফিসে ঘুষের অভিযোগ বেশ পুরানো। ২০২৫ সালে দুদক গণহারে ৩৫টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান চালায়, যেখানে দলিল রেজিস্ট্রি, নকল উত্তোলন,পর্চা ঠিক নেই, এনআইডি কার্ডে নামের বানান ভুল, নামজারি সঠিকভাবে হয়নি ইত্যাদি অভিযোগ তুলে সেরেস্তা খরচের নামে দলিল প্রতি ৯ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গতবছর পল্লবী সাব রেজিস্ট্রার থাকাকালীন সময়ে প্রদীপ কুমার বাউনিয়া মৌজার ১০ শতক ফ্রেশ ভিটা জমি ডোবা-নালা ও পরিত্যক্ত দেখিয়ে একটি ডেভলপার কোম্পানিকে দলিল রেজিষ্ট্রি করে দিয়ে এক দলিল থেকেই ৪০ লাখ টাকা কব্জা করে নেন। পরে সংবাদমাধ্যমে হৈচৈ পড়ে গেলে তড়িঘড়ি করে প্রদীপ কুমার কে চর রাজিবপুব সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে বদলি করা হয়। ( চলবে )
( এরপর এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত পড়ুন আমাদের প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে )
আপনার মতামত লিখুন :