
সজীব আকবর,অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
ঝিনাইদহ শহরকে যানজটমুক্ত ও সৌন্দর্য বর্ধিত করণের লক্ষ্যে ৪০ কোটি টাকার মেগা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে এ দুর্নীতি ও পুকুর চুরি ধামাচাপা দিতে তাৎক্ষণিক তদন্তের নামে সড়ক ও জনপথ ঝিনাইদহের শীর্ষ দুই কর্তার ইউটার্ন বা ভোল বদলের বিষয়টি সাধারণ আমজনতা বাহবা দিলেও ঠিকাদারদের একাংশ ও সচেতন মহলে মিশ্র প্রতিক্রীয়া ও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম শ্রেণীর একজন ঠিকাদার আজকের পেপার কে বলেন, এসও হাসান আল মামুন এখানে “বলির পাঁঠা”। এই সড়ক নির্মাণে যে বড়ো ধরনের ঘাপলা হবে তা এসও মামুন হাড়েহাড়ে জানতেন। তাই স্পটে শুরু থেকেই তিনি ছিলেন গরহাজির। তবে এলাকাবাসী কাজের মান নিয়ে ব্যাপক শোরগোল শুরু করলে তাৎক্ষণিক নিজেদেরকে ধোয়া তুলসীপাতা প্রমাণ করতে এবং “”গোপন উপঢৌকন গ্রহণের বিষয়টি মাটিচাপা দিতে”” লোক দেখানো তদন্তে মাঠে নামেন উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দিন ও নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন !!!
পরবর্তীতে সওজ ও জনপথ ঝিনাইদহের শীর্ষ দুই কর্তা “”ধরি মাছ, না ছুঁই পানি”” স্ট্যাইলে বহাল তবিয়তে থেকে যাবেন, আর বলির পাঁঠা এসও হাসান আল মামুনকে হয় ওএসডি অথবা শাস্তিমূলক বদলি করে দেওয়া হতে পারে কোনো দূর্গম অঞ্চলে। মানে “” উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে””। অর্থাৎ ঝিনাইদহবাসী জানবে ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশে বড়ো ধরনের দুর্নীতি করাই এসও হাসান আল মামুনকে অপসারণ করা হয়েছে। তবে নির্মম সত্য এই যে, নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ বিভাগীয় প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে একজন এসও’র পক্ষে এককভাবে দুর্নীতি করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে সাববেজ (ভিত্তিস্তর) তৈরির ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী উন্নতমানের খোয়া ব্যবহার না করে সরাসরি আস্ত ইট ও বালি ছাড়া শুধু মাটি বিছিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
রোববার (৪ঠা অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে সরেজমিনে পরিদর্শনে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে সড়ক থেকে আস্ত ইট তুলে নিতে দেখা যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল থেকে আড়াপপুর হয়ে হামদাহ পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণে দুই প্যাকেজে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৮ ফুট সড়কটিকে ৩০ ফুটে উন্নীত করার অংশ হিসেবে ১৬ কোটি টাকায় ‘রিজিড পেভমেন্ট’ এবং ২৪ কোটি টাকায় ‘ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট’ নির্মাণের কথা। মূল কাজটি পেয়েছে ‘হাসান টেকনো’ ও ‘মাসুদ হাইটেক’ নামের দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
তবে সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ঠিকাদার নিজে কাজ না করে বাবু পাটোয়ারী নামের এক সাব-ঠিকাদারের কাছে পুরো কাজটি মোটা অংকের কমিশন নিয়ে বিক্রি করে দেয় বলে গুঞ্জন রয়েছে ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “শুরুর দিন থেকেই এই মেগা প্রকল্পের কাজে চরম ছলচাতুরির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। সাববেজ নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো বালি ব্যবহার করা হয়নি, মাটি আর নিম্নমানের আস্ত ইট দিয়ে রোলার করা হচ্ছে। সরকারি কোটি কোটি টাকার বাজেট হলেও এভাবে কাজ করা মানে স্রেফ জনগণের ট্যাক্সের টাকা পানিতে ফেলা।” আর রহস্যজনক কারণে কাজ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত এসও হাসান আল মামুনও ছিলেন গরহাজির।
এলাকাবাসীরা বলেছেন, সরকারি খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজের স্থানে তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) হাসান আল মামুনের সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও কাজের সাইটে তাঁর কোনো দেখা মেলেনি এক মিনিটের জন্যও।।
সংবাদ পেয়ে বিকেলেই কাজের সাইট পরিদর্শনে আসেন ঝিনাইদহ সওজের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন এবং নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন।
উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন বলেন, “যেভাবে কাজটি করা হচ্ছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্দিষ্ট গ্রেডের খোয়া না দিয়ে আস্ত ইট বিছিয়ে সড়ক প্রস্তুত করা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
ঘটনাস্থলে কাজের ধরণ দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন জানান, “এভাবে আস্ত ইট ও মাটি দিয়ে সড়ক নির্মাণ করার কোনো সরকারি বিধান নেই। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সাইট ভিজিট করে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। নিয়মানুযায়ী সিডিউল মেনে নতুন করে সঠিক গ্রেডের খোয়া ও বালি দিয়ে সাববেজ প্রস্তুত না করা পর্যন্ত বিল ছাড় দেওয়া হবে না।”
তবে শীর্ষ এই দুই কর্তা মিডিয়ার সামনে যাই বলুক না কেনো,কয়েকজন ঠিকাদার ও সচেতন মহল বলছেন
এদিকে অনিয়মের বিষয়ে জানতে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাসুদ হাইটেক বা হাসান টেকনোর কোনো প্রতিনিধিকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। আর কাজের দায়িত্বে থাকা সাব-ঠিকাদার এসআর ইন্টারপ্রাইজের মালিক বাবু পাটোয়ারীর সাইট ম্যানেজার মাসুদ ও সুপারভাইজার লিটন জানান, আমাদেরকে যেভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আমরা সেভাবেই কাজ করাচ্ছি। কাজের সাইটে আমাদের ইচ্ছে অনিচ্ছে প্রয়োগের বিন্দু মাত্র সুযোগ নেই।।
এ প্রতিবেদনের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ বিভাগীয় প্রকৌশলীর বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।।
আপনার মতামত লিখুন :