
আহসান হাবিব মিলন, রংপুর ব্যূরো প্রধান
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বড়বাজার/বরিগঞ্জ-ইসলামপুর এলাকায় জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিতর্কিত ওই জমি নিয়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা চলমান থাকার মধ্যেই সম্প্রতি হাইকোর্টের আদেশে ছয় মাসের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে জমিটির মালিকানা, পুরোনো দলিলের বৈধতা, রেকর্ড ও দখল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাপ্ত আইনগত মতামত ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের ১৬৮২৩ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। ওই দলিলে নাবালক ইদ্রিস আলীর পক্ষে তার মা ও অভিভাবক জোবেদা খাতুন এবং জাহেদুল হকের নাম দাতা হিসেবে এবং মোকছেদ আলীর নাম গ্রহীতা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। দলিলটিতে ১৯৮১ সালের ১২ মে তারিখের ১১১৩৫ নম্বর একটি দলিলের উল্লেখ থাকলেও সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিসে অনুসন্ধান করে ওই দলিলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে আইনগত মতামতে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় পরিষদের প্রত্যয়ন অনুযায়ী, ইউনুছ আলী ১৯৯৬ সালের ১০ অক্টোবর মারা যান। আইনগত মতামতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ১৯৮৫ সালের দলিলের মাধ্যমে ইউনুছ আলীর মালিকানাধীন সম্পত্তি তার জীবদ্দশায় তার স্ত্রী বা সন্তানদের মাধ্যমে হস্তান্তরের আইনগত ক্ষমতা ছিল কি না। এ বিষয়টিকেই দলিলটির বৈধতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে ওই দলিলের ভিত্তিতে ১৯৯০-৯২ সালের দিকে জমির রেকর্ড প্রতিপক্ষের নামে করা হয়। তবে এ রেকর্ড ও দলিলের বৈধতা নিয়ে বিরোধ রয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন।
জমির দখলকে কেন্দ্র করে মনোয়ারা বেগমের পরিবারের সঙ্গে হাতেম আলী, মোকছেদ আলীসহ সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের বিরোধের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিরোধ মীমাংসায় মিঠাপুকুর থানায় একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এমনই একটি বৈঠকের সময় হুমকির ঘটনায় মনোয়ারা বেগমের স্বামী অসুস্থ হয়ে স্ট্রোক করে মারা যান। এ ঘটনায় পরবর্তীতে মামলা আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
এ ছাড়া ২০২৩-২৪ সালেও মনোয়ারা বেগম, তার দুই বিধবা বোন ও পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা ও আহত করার অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ফৌজদারি মামলাও চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, বিতর্কিত দলিলের ভিত্তিতে জমিটি পরবর্তীতে প্রাণ-আরএফএল সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। জমি কেনার আগে মালিকানা, দলিল, খতিয়ান, রেকর্ড, দখল ও আদালতে চলমান মামলাগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহলের কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারক হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, নিম্ন আদালত ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর একটি মামলা খারিজ করেন। পরে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর রংপুর জেলা জজ আদালতের রায়ে ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করা হলে উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে রুল জারি করেন এবং বিরোধপূর্ণ জমিতে ছয় মাসের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
আইনজীবীদের মতে, স্থিতাবস্থা কোনো পক্ষের চূড়ান্ত জয় বা পরাজয়ের ঘোষণা নয়। এটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জমির বিদ্যমান অবস্থা অপরিবর্তিত রাখার অন্তর্বর্তী নির্দেশ। তাই আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের পক্ষেই নিজেদের দাবিকে চূড়ান্ত মালিকানা হিসেবে উপস্থাপন করা আইনগতভাবে নিরাপদ নয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি জমির প্রকৃত মালিকানা, দলিলের বৈধতা, রেকর্ড ও দখল নিয়ে সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে দ্রুত আইনগত নিষ্পত্তি হবে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
আপনার মতামত লিখুন :