
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক,মিরপুর, ঢাকা:
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও নানা অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাবেক নাইটগার্ড হাজী শাহাবুদ্দিনের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। অফিস ভবনটি শাহাবুদ্দিনের ঘনিষ্ঠজনের মালিকানাধীন হওয়ায় তাদের প্রভাব আরও দৃঢ় হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রকাশ্যে দাবি করে—“মিরপুরে যে সাব-রেজিস্টার আসে, তাকে আমরা ‘সব রেজিস্টার’ বানিয়ে ফেলি।” ভুক্তভোগীরা জানান, অফিসে সেবা নিতে গেলে নির্দিষ্ট এই সিন্ডিকেটের মাধ্যম ছাড়া কোনো কাজ সম্পন্ন করা যায় না। ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা, অযথা জটিলতা তৈরি করা এবং হয়রানি করা নিত্যদিনের ঘটনা। এমনকি সাংবাদিকদেরও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, অনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখানো হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। অফিসটির অবস্থান জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে দূরে হওয়ায় কার্যত কোনো তদারকি নেই। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যরাই অফিস পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করছে। অনেক ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রাররাও তাদের চাপে জিম্মি হয়ে পড়েন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তারা দালালদের মাধ্যমে প্রতিটি দলিল নিবন্ধনের জন্য কয়েক হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করে। দারোয়ান আলমসহ কয়েকজন সদস্য অফিসে প্রবেশ ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যরা অবৈধ উপায়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
মিরপুরের শাহআলী বাগ এলাকায় বহুতল ভবন, একাধিক ফ্ল্যাট, সাভারে জমি এবং বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা তাদের সম্পদের অংশ বলে জানা গেছে। এক সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই অফিস পুরোপুরি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। তাদের অনুগত লোকজনের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়, যা ভাঙা অত্যন্ত কঠিন।” এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একাধিক অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। ফলে সিন্ডিকেটটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
১. আবাসিক ভবন:
মিরপুর-১ এর শাহআলী বাগ এলাকায় (বাড়ি নং ১১৬/এ, জনতা হাউজিং ৩ নম্বর গেট সংলগ্ন) শাহাবুদ্দিনের একটি সাড়ে ছয় তলা ভবন রয়েছে। ভবনটিতে মোট ১৩টি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং বর্তমানে এটি আল-কারিম কিরাতুল কোরআন মাদরাসার কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ভবনটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।
২. ‘তায়েফ ভবন’-এ ফ্ল্যাট:
পূর্ব শাহআলীবাগের ধানক্ষেতের মোড়ে অবস্থিত ‘তায়েফ ভবন’ (বাসা-৩৭)-এ তার মালিকানাধীন ৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
৩. জমি:
সাভার থানার মশুরের গোলা এলাকায় তার প্রায় ২০০ শতাংশ জমি রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
৪. বিলাসবহুল গাড়ি:
তার নামে ঢাকা মেট্রো-চ-৫১-২১১৭ নম্বরের একটি মাইক্রোবাস ক্রয় করা হয়েছে।
এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, ফজর আলী, সাগর, সবুজ, নয়ন, পিয়াস ও খোকনসহ একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে রাজধানী ঢাকা ও বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছে।
একাধিক সেবা গ্রহীতার দাবি, এই সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ নিয়মিত হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের অভিযোগে জানা যায়, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে নানা তথ্য-প্রমাণ উঠে এসেছে।
ভুক্তভোগী সেবা গ্রহীতারা সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, এ ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে সাধারণ মানুষের জন্য সেবা প্রাপ্তি সহজ ও হয়রানিমুক্ত করা হোক। ঘুষ-বাণিজ্য, জাল দলিল, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে জিম্মি সেবাগ্রহীতারা; অভিযোগের পরও নেই কার্যকর ব্যবস্থা।
আপনার মতামত লিখুন :