
সজীব আকবর,অনুসন্ধানী প্রতিবেদক।।
নরসিংদী জেলা রেজিস্ট্রার(D.R) মো: আরিফুর রহমান এর ঘুষ দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্যের কারণে দিশেহারা গোটা জেলার মানুষ। পদে পদে হয়রানি অসহযোগিতা ও বেআইনী কর্মকাণ্ডে দিশেহারা ভূক্তভোগীরা। জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের আওতাধীন গোটা জেলার ৬ টি সাব রেজিস্ট্রি অফিস চলছে “কর্তার ইচ্ছেই কর্ম” সিস্টেমে। জেলা সদর সহ ৬ টি সাব রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি কর্মদিবসে দলিল সম্পাদন হয় কমপক্ষে এক হাজার৷ ২০ কর্ম দিবসে ২০ হাজার।

প্রতি দলিল থেকে রেজিষ্ট্রেশন বাবদ ডিআর এর নামে জমা হয় দলিল প্রতি ৫০০ টাকা করে, সে হিসেবে প্রতি মাসের ২০ কর্মদিবসে আরিফুর রহমানের ঝুলিতে জমা হয় কোটি টাকা। এছাড়া নকল উত্তোলনে বড়ো স্যারের নাস্তা খরচ ৩০০ টাকা হারে আসে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। এমনটাই বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্টাফ।
শুধু এই দেড় কোটি টাকার হিসেবই নয়, এর সাথে আছে স্টাফদের বদলি, NOC, পদোন্নতি,নিকাহ রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়নের নামে বছরে দুবার মাথাপিছু ৫ হাজার টাকা করে কর্তন। আর এই নবায়ন বাণিজ্য থেকে আসে প্রতি ৬ মাস পরপর কোটি টাকার হিস্যা।
এছাড়াও আছে প্রতি তিনমাস পরপর বাধ্যতামূলক ৬ টি উপজেলা অফিস ভিজিট থেকে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা। এর বাইরেও আছে নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য ও পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিনব ফাঁদ।
আপামর জনসাধারণ সকলেই জানে ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা সকলেই সমান অপরাধী। তারপরও তারা কেনো অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছেন ?? এমন প্রশ্নে একজন দলিল লেখক ও একজন অফিস স্টাফ বললেন, শুধু “”তত্ত্ব কথায়”” এখানে কাজ হবেনা। তাই চাহিদা মোতাবেক টাকা যারা দিতে পারবে তাদের কাজ ১ ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টার মধ্যে হয়ে যাবে। আর যারা বেশি আইন খাটাতে যাবে তাদের কে ঘুরতে হবে বছরের পর বছর।। তারপর কাজ হবেনা।।

সারা দেশের ন্যায় নরসিংদী জেলা রেজিস্ট্রার অফিস ও ৬ টি উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিস যথাক্রমে নরসিংদী সদর, মনোহরদী, শিবপুর, পলাশ,বেলাবো ও রায়পুরা প্রতিটি অফিসে দুর্নীতি বহু আগে থেকেই ওপেন সিক্রেট!! এসব অফিসে কর্মরত উমেদার, মোহরার, টিসি মোহরার,রেকর্ড কিপার, অফিস সহায়ক, অফিস সহকারী থেকে প্রধান সহকারী সবাই কোটি পতি। সাব রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রাররাও শত-শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক।
ফলে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এসব কর্মকর্তারা স্টাফদেরও দেন উপরি ইনকামের অবাধ সুযোগ। প্রমাণ হিসেবে বলা যায়–

১৬ তম গ্রেডের এই অফিস সহকারীর বেতন, ঘড়ভাড়া ও মেডিকেল ভাতা সহ সর্বসাকুল্যে তাঁর বেতন দাঁড়ায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা দাঁড়াতে পারে ২২ হাজার ৩০০ টাকায়। পরিষ্কার বাংলায় বলা যায়, এই সামান্য ৭০০ বা সাড়ে ৭০০ টাকা দিন ইনকামের কাজে সংসারের ভরনপোষণ শেষে কিছুই থাকার কথা নয়। লন্ডন তো লন্ডন, এই সামান্য বেতনে চাকরি করে সংসার খরচ, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কোচিংয়ের বেতন, পূজাপার্বণ, পোশাকআশাকের পিছনে খরচ করে যেখানে আরো ঋণে জর্জরিত হওয়ার কথা। বা বছরান্তে একবার কূয়াকাটা কিম্বা কক্সবাজার ঘুরে আসাটাই যেখানে দুঃস্বপ্ন হওয়ার কথা “” সেখানে সরাসরি গ্রেট বৃটেন তথা লন্ডন “”?? তার মানে জেলা রেজিস্ট্রার নিজে যেমন দুহাতে কামাচ্ছেন, অফিসের প্রতিটি চেয়ার টেবিলেও কামাচ্ছে, যেটা স্পষ্ট জানেন ডিআর আরিফুর রহমান ? তা না হলে তো যখন ওই মহিলা অফিস সহকারী লন্ডন তথা যুক্তরাজ্য সফরের আবেদন করেছিলেন ডিআর এর উচিৎ ছিলো তখনই ধমক দেওয়া। ওই স্টাফকে বলতে পারতেন, তোমার বেতন কতো, লন্ডনে যে যাবে খরচের টাকা আসবে কোথা থেকে ?? অথবা বলতে পারতেন –বাড়ির পাশে ভারতে যাও। সেখানে অনেক দর্শনীয় স্থান আছে। আছে অসংখ্য ধর্মীয় তীর্থস্থান। তাতে সময় ও খরচ দুটোই বাঁচবে। কিন্তু আরিফুর রহমান সেটা বলতে পারেন নি। পাছে ওই মহিলা যদি আবার দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম বা মিডিয়ার সামনে ডিআর আরিফুর রহমানের থলের বিড়াল বের করে দেয়।

আবার শেখ হাসিনা সরকার যতদিন বহাল ছিলেন তখন একদিনের জন্যও আরিফুর রহমান তাঁর নাম ছবি বা মোবাইল নাম্বার হাইড করেননি। অথচ এখন জেলা রেজিস্ট্রারসহ জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের কোনো স্টাফের মোবাইল নাম্বার ওয়েবসাইটে দৃশ্যমান নয়। শুধু জেলা রেজিস্ট্রি অফিসই নয়। একমাত্র বেলাবো সাব রেজিস্ট্রার ছাড়া বাকি ৫ টি অফিসে কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছবি বা মোবাইল নাম্বারের কোনো অস্তিত্ব নেই। অনুসন্ধানে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। আবার সদরের সাবেক সাব রেজিস্ট্রার সোহরাব হোসেন সরকার একবছর আগে অবসরকালীন ছুটিতে চলে গেলেও সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের ওয়েবসাইটে সোহরাব হোসেনের নাম স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। নামটি চেঞ্জ করার কেহ প্রয়োজন মনে করেনি।

আবার মনোহরদীতে সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে গোবিন্দ সাহা দায়িত্ব পালন করলেও ওয়েবসাইট একদম ফাঁকা, সেখানে কারো নাম নেই। আতাউর রহমান জুলহাস নামক একজন মোহরার গত তিনমাস আগে মনোহরদীতে যোগদান করলেও মনোহরদী অফিসের ওয়েবসাইটে তার নাম ও ছবি নেই। তবে তার পূর্বতন কর্মস্থল শিবপুরে আতাউর রহমানের নাম এখনো লেপ্টে আছে।

আবার সপ্তাহে তিন দিন করে সাব রেজিস্ট্রার গোবিন্দ সাহা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সেটা কোথাও উল্লেখ নেই। এছাড়া শিবপুর সাব রেজিস্ট্রার মিজারুল ইসলামথে সপ্তায় দুদিন সদরে ডিউটি করলেও তা হাইড করে রাখা হয়েছে।। জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরে ৬ জন সাব রেজিস্ট্রার ও একজন জেলা রেজিস্ট্রার সহ ৩৫/৪০ জন কর্মচারীর মধ্যে ৫ জন ছাড়া কারো মোবাইল নাম্বারের অস্তিত্ব নেই। এভাবে মৎস্যন্যায় অবস্থার মধ্য দিয়ে জন ভোগান্তি আর অসহযোগিতার মাধ্যমে শুধু অবৈধ টাকার পাহাড় গড়ার একমাত্র মিশন নিয়ে লেগে আছেন আরিফুর রহমান। ফলে অধিনস্ত সকল সাব রেজিস্ট্রার ও স্টাফরাও হাঁটছে একই পথে।
মানে
“”মহাজ্ঞানী মহাজন,
যে পথে করে গমন হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়,
সেই পথ লক্ষ্য করে, স্বীয় কীর্তি-ধ্বজা ধরে,আমরাও হব বরণীয়।
আপনার মতামত লিখুন :