
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে ২৭৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেছেন র্যাবের (বর্তমানে এসআরবি) এক কর্মকর্তা হত্যা মামলার আসামি ও আলীনগরে ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন। সলিমপুর মৌজার বিভিন্ন দাগের এসব জমি আলীনগরের বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন তিনি।
নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ১৭ই সেপ্টেম্বর থেকে ১লা অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৭৪টি দলিলের মাধ্যমে এসব জমি বিক্রি ও রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। ইয়াসিন এক শতক থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতক পর্যন্ত জমি বিক্রি করেছেন।

এসব জমির রেজিস্ট্রি করে দেন সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বুধবার তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাবীবের বদলির আদেশ ৭ দিনের জন্য স্থগিত করেছে মন্ত্রণালয়। তবে নকলনবিশ পলাশ বৈদ্য ও এক্সট্রা মোহরার মিল্টন কুমার নাথ এর বিভাগীয় শাস্তি বা বদলি হবে কি-না তা এখনো জানা যায়নি। আইজিআর মহোদয়া শামিম আফরোজ ও দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম সরাসরি তদন্ত করলেই বিষয়টি সম্পর্কে সকল ধোঁয়াশা কেটে যাবে বলে মনে করেন সচেতন এলাকাবাসী।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ই মার্চ প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন। এর আগে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়নি। বরং অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

ওই অভিযানের পর থেকে ইয়াসিনসহ অন্য সন্ত্রাসীরা পলাতক। পরে জঙ্গল সলিমপুরের এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে পৃথক দুটি চৌকি স্থাপন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে সরকার।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-
ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এগোলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকে একটি সড়ক পাহাড়ের ভেতরে চলে গেছে। সেই পথেই জঙ্গল সলিমপুরের শুরু। এলাকাটি মূলত জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর—এই দুই অংশে বিভক্ত।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। আলীনগর দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিন ও তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানে পুলিশের অভিযানের পর ইয়াসিন ও তার সহযোগীরা পালিয়ে যান।
ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিনের কাছে আরও জমির দলিল রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আরএস ও বিএস খতিয়ান পরিবর্তন করে এসব জমির দলিল করা হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ৪ হাজার ৮১৮ থেকে ৫ হাজার ১৩৩ দলিল নম্বরে ২৭৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেছেন ইয়াসিন। বিএস দাগ নম্বর ২০১-এ করা হয়েছে ৬৬টি দলিল।
একদিনে এত জমির দলিল রেজিস্ট্রি করার বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব বলেন, সীতাকুণ্ডের ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী, এসব জমি ইয়াসিনের নামে নামজারি করা আছে। ইয়াসিন খাজনাও দিয়েছেন। কাগজপত্র ও দলিলসহ এসব জমির জন্য আবেদন জমা দেন আইনজীবী নাজিম উদ্দিন।
‘কাগজপত্র ঠিক থাকায় দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি’, বলেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম বলেন, জমির দলিলগুলো না দেখে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা মুশকিল। সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব জানিয়েছেন, সবগুলো আইন মেনেই করা হয়েছে। আমরা ভূমি অফিসের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি।
চলতি বছরের ১৯শে জানুয়ারি এক আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাতে কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করে র্যাবের একটি দল। পরে মাইকিং করে ইয়াসিন বাহিনী ও স্থানীয়দের একটি অংশ র্যাব কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। হামলায় আরও তিনজন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :